করোনা লাইভ
আজকে আক্রান্ত : ২,৬৯৫ ◈ আজকে মৃত্যু : ৩৭ ◈ মোট সুস্থ্য : ১১,৫৯০
প্রচ্ছদ / সারাদেশ / বিস্তারিত

করোনায় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন ময়মসিংহের ইউএনও

৮ এপ্রিল ২০২০, ৪:১০:০৬

ময়মনসিংহ থেকে প্রতিনিধি ঃ মোঃ ফকির তানভীর
রাত তখন সাড়ে আটটা। চোখে মুখে আতঙ্ক লেপ্টে আছে মা ও সন্তানদের। দিনভর কিছু খেতে না পেয়ে ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। মলিন মুখে রাস্তার কিনার ঘেঁষে অবিরাম হেঁটে চলা। কোলে দুই বছর বয়সী ছেলে ইমরান। হাতে কাপড়ের ব্যাগ। মায়ের সাথে হাটছে ছয় বছর বয়সী জাহিদুল। তার কাঁধেও আরো একটি ব্যাগ। মায়ের পায়ে পা’ মিলিয়ে কতো পথ হেঁটেছে জাহিদুল তা ক্রমিকে বলা অসম্ভব। কনক্রিটের শহর ছেড়ে জন্মভূমে সন্তানদের নিয়ে ফিরে আসেন পোশাক শ্রমিক রোজিনা বেগম। করোনাকালে চারদিকে আতঙ্কের মধ্যে রোজিনার এ ঘরে ফেরার দীর্ঘ এক ‘ইতিহাস’। এমন কঠোরতর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি ২৬ বছরের জীবনেও।

রোজিনার বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জের রাজিবপুর ইউনিয়নের সুতিভরাট গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আমিনুল হকের মেয়ে। রোজিনা স্বামী আবুল বাশারের বাড়ি মগটুলা ইউনিয়নের মগটুলা গ্রামে। রোজিনা গাজীপুরের মালেকাবাড়ি এলাকায় একটি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তার স্বামী আবুল বাশার মালেকাবাড়িতেই একটি চালের দোকানে কাজ করে।
করোনা ইস্যুতে সরকারি ছুটি শুরু হলে বন্ধ হয়ে যায় পোশাক কারখানায়। তাই ছুটিতে বাড়ি চলে আসে রোজিনা ও তার স্বামী। রোজিনার ছয় বছর বসয়ী ছেলে জাহিদুলকে বাবার বাড়িতেই রাখতেন। কিন্তু এবার ছুটিতে আসার পর দেশের খারাপ পরিস্থিতির কারণে ছেলেকে সাথে করে নিয়ে যান। সংগ্রাম করে গাজীপুরে যাওয়ার পর জানতে পারেন তাদের কাজে যোগ দিতে হবে না। তাই ফের বাড়ি ফিরে এসেছেন।
কর্মস্থলে যোগ দিয়ে মাস শেষে মাইনে পাবেন এমন আশা নিয়ে গেলেও তা নিষ্ফল হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে আসবে এমন টাকাও নেই রোজিনাদের হাতে। স্বামী আবুল বাশার ৪০০ টাকা ধার করে স্ত্রী-সন্তানদের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। টাকার অভাবে স্ত্রী-সন্তানদের সাথে আসতে পারেননি আবুল বাশার। সড়কে যানবাহন চলাচলে কঠোরতার কারণে রোজিনাকে বাড়ি ফেরার পথে চরম কষ্ট করতে হয়েছে।
খোলা যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে গুনতে সব টাকা শেষ হয়ে যায় মাঝপথেই। সকাল ৯ টায় যাত্রা শুরু করা রোজিনা তপ্ত রোদে অনেক পথ হাটতেও হয়েছে। সকালে এক মুঠো ভাত খেতে পারলেও দিনভর আর কিছু খাওয়া হয়নি রোজিনার। দুই ছেলেকে নিয়ে মলিন মুখে বাড়ি পথে ফেরা রোজিনার অসহায়ত্বের কথা শুনে এক ব্যক্তি আরো একশত টাকা দেয় রোজিনাকে। তা দিয়ে কিছু পথ যেতে পারে সে। রাত ৮ টার দিকে মধুপুর বাজারে পৌঁছায় রোজিনা।
রাত বাড়ার সাথে সাথে রোজিনার ভেতরে শুরু হতে থাকে আতঙ্ক। পেটে নেই খাবার। ওদিকে রাত বাড়ছে। সড়কে নেই কোনো যানবাহন। অনেকক্ষণ যানবাহনের জন্য অপেক্ষার পর নদীর কোল ঘেঁষা গ্রামের ঝোপ-জঙ্গলের সড়ক ধরে বাড়ি যেতে হবে একা হেঁটে, জীবনে কখনও হয়তো কল্পনাও করেনি। তবুও এই করোনাকালে নিরুপায় হয়ে হাটতে শুরু করেছিল রোজিনা।

কিন্তু হঠাৎ রোজিনার সামনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি। সোমবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে রোজিনার দেখা মেলে ঈশ্বরগঞ্জের মগটুলা ইউনিয়নের মধুপুর-রাজিবপুর সড়কের মধুপুর উত্তরবাজারে। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের Md Zakir Hossen রাত্রিকালীন মনিটরিং করার সময় গাড়ির সামনে পড়ে রোজিনা। রোজিনাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে তোলা হয় গাড়িতে। প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে রোজিনার বাড়িতে পৌঁছে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন। সেই সাথে রোজিনাকে চাল, ডালসহ কিছু খাদ্যসামগ্রীও তুলে দেন।

যন্ত্রণাবহুল যাত্রা পথের শেষাংশে মানবিক এক ইউএনওর দেখা মেলা সৌভাগ্য মনে করেছেন রোজিনা। রাতের এই ছোট পথও অনেক দীর্ঘ হতো ক্ষুদা-তৃষ্ণায় কাতর রোজিনা ও তার ছেলের। একজন মানবিক ইউএনওর দেখা মেলায় শেষটা তাদের ‘মধুর’ হয়েছে। সরকারি গাড়িতে যাত্রার শেষ অংশে বাড়ি ফেরার সুযোগ পাওয়ার পাশপাশি খাদ্যসামগ্রী পেয়ে আপ্লুত রোজিনা-চোখের জলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মানবিক ইউএনওর প্রতি।

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: