fbpx
প্রচ্ছদ / সারাদেশ / বিস্তারিত

গেস্টরুম সংস্কৃতি বন্ধ করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঢাবি ছাত্রের খোলা চিঠি।

২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৯:৪৬:৫৯

তখন রাত ১ টা। একটি ছেলে বিষণ্নমনে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের পাঠকক্ষে প্রবেশ করল। চোখেমুখে বিষণ্নতার ছাপ। বেঞ্চে বসে টেবিলে বইখাতা রেখে মাথা নিচু করে খানিক্ষণ নিজের চুল টানল। এভাবে কেটে গেল অনেক্ষণ। আমি পাশের সিটে বসে আছি। হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার চোখ থেকে টপটপ করে জল ঝড়ছে। সে লজ্জা পাবে তাই চোখ ফিরিয়ে নিলাম। এমন ভাব করলাম যেন আমি কিছুই দেখিনি। বারকয়েক বই খুলে কি জানি পড়তে চাইল কিন্তু কোনভাবেই নিজেকে সামলে নিতে পারলনা।

ছেলেটি চোখ মুছে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। বইখাতা নিয়ে পাঠকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। আমি গিয়ে তার পথ আটকে দাঁড়ালাম। আমাকে এভাবে দেখে বিব্রত হল। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেমন আছি। আমি বললাম, ভাল আছি। তোমার কি হয়েছে? ছেলেটি ফুফিয়ে কেঁদে উঠল। অঝোর ধারায় তার চোখ থেকে জল ঝরছিল। আমি তাকে সান্তনা দিয়ে হলের খোলা মাঠে নিয়ে গেলাম।

অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি রয়েছে এই হলের খোলা মাঠের। রাজ্যের দুশ্চিন্তা নিমেষে উধাও হয়ে যায় এই মাঠে বসার সাথেসাথে। বাগানের ফুল, ঐতিহ্যবাহী ঝাউ গাছ, সবুজ ঘাসের স্নিগ্ধতা রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যায়। ভুলিয়ে দেয় সারাদিনের সকল গ্লানি, ক্লান্তি, অবসাদ।

মাঠের মধ্যখানে সবুজ ঘাসের ওপর বয়সী ঝাউগাছটির তলায় ছেলেটির সাথে মুখোমুখি বসলাম।
গল্পের ছলে জানতে চাইলাম বিষণ্নতার কারণ। সে বলতে লাগল। “ভাই, অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছি।

আমার বাবা মা আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন। আমার বাবা একজন কৃষক। অপরের জমিতে বর্গা চাষ করেন। এরপরও প্রতিমাসে আমার জন্য তিনহাজার টাকা পাঠান। প্রতিদিন মা ফোন দিয়ে জানতে চান, “বাবা তুই লেখাপড়া করছিস?” ভাই, আমি কিছুতেই লেখাপড়ায় মন বসাতে পারছিনা। আজ সারাদিন মধুতে প্রোগ্রাম ছিল। দুপুরে ক্লাস করতে পারিনি। সকাল ১১.০০ টা থেকে থাকতে হয় মধুতে। কোন কাজ নেই। শুধু শুধু আমাদেরকে দাঁড় করিয়ে রাখে। মধুতে গিয়ে কদু ভাইয়ের (ছদ্মনাম) সাথে হাত মিলানো, কিছুক্ষণ পরপর স্লোগান দেওয়া এটাই আমাদের কাজ। আমাদেরকে সেখানে দুপুর দুটা পর্যন্ত থাকতে হয়। আবার সন্ধ্যার পর হাকিম চত্বরে গিয়েও পূর্বের পুনরাবৃত্তি করতে হয়। এখানে রাত ৯.০০ টা পর্যন্ত থাকতে হয়। তাড়াহুড়ো করে রাতের খাবার খেয়ে আবার দৌড়ে গেস্টরুমে যেতে হয়। এত প্যারা নিতে পারছিনা ভাই।
আমি এই হল ছেড়ে চলে যাব। ঢাকা শহরের পথেঘাটে থাকব। নাহয় আমি আত্মহত্যা করব। দেখেন, সারাদিন পড়ালেখা করতে পারিনি। রাতে গেস্টরুমে ভাইদের অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল। সবাই একসাথে এমনভাবে চিৎকার দেয়। সারারাত ঘুম হয়না। ক্লাসে মনযোগ দিতে পারিনা। পড়ালেখায় মনযোগ দিতে পারিনা। এখন এসে পড়তে বসেছি। মাথা ভনভন করছে। শুধু এসব ঘোরপাক খাচ্ছে। তাই চলে যাচ্ছি।”

কথা বলতে বলতে ছেলেটি অঝোর ধারায় কাঁদছিল। আবার নিচু গলায় কথা বলছিল। কথা বলার ফাঁকে এদিকওদিক তাকাচ্ছে । পাছে কেহ দেখে ফেলে কিংবা শুনে ফেলে। গেস্টরুম থেকে নিষেধ করা হয়েছে তৃতীয় বর্ষের কোন ভাইয়ের সাথে সম্পর্ক না রাখতে। এটাকে বলা হয়, ঘোড়া ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাওয়া। এটি ক্ববিরা গুনাহ। কেউ এটি করলে তাকে শাস্তিস্বরূপ হল থেকে বের করে দেওয়া হবে।
ছেলেটির কথা শুনে আমি সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলি।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। মাত্র কয়েকদিন হল বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত পরিবেশ জ্ঞানার্জন করবে। বাবা ময়ের স্বপ্ন পূরণ করবে। সুশিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতির হাল ধরবে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার সাথেসাথে তার পায়ে শিকল পরিয়ে দেওয়া হল। তাকে বিনাপারিশ্রমিকে দাসে পরিণত করা হল। তার স্বপ্নকে মাটিচাপা দেওয়া হল।
এটি শুধু একটি ছেলের গল্প নয়। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অবস্থানরত প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীর হতাশার গল্প।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি দুষ্টচক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। যারফলে তাদের মানসিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ওরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো সাহসী হয়ে উঠতে পারছেনা। ওরা অন্যায়কে মেনে নেওয়ার চর্চা ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। যার প্রয়োগ করছে কর্মক্ষেত্রে। তাই দেশের প্রত্যেকটা সেক্টর চলে গেছে দুর্নীতিবাজদের দখলে।
সত্যিকারের বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিট পলিটিক্স এবং গেস্টরুম প্রথা বন্ধ করতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি বাংলাদেশে প্রচলিত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করিনা। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আপনি। তাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কিংবা আচার্যের কাছে না লিখে সরাসরি আপনার কাছে লিখলাম।
আপনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার মহান দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নিয়েছেন। এই সোনার বাংলা গড়ার কারিগর হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আসা একেকটি ফুল। আপনি এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান গেস্টরুম প্রথা এবং সিট পলিটিক্স বন্ধ করতে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

লেখক:মাহবুবুর রহমান সাজিদ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: