fbpx
প্রচ্ছদ / জাতীয় / বিস্তারিত

চট্টগ্রামে রেকর্ড ভেঙেছে জলাবদ্ধতা

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭, ১১:৪০:৩২

চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও বিদায়ী বছরের একটি বড় সময়জুড়েই শহরটি ছিল পানির নিচে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে নগরীর দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও এবারের জলাবদ্ধতা স্মরণকালের সব রেকর্ড ভেঙেছে। টানা বৃষ্টির কারণে এবার জলাবদ্ধতা ছিল আট মাস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতার কারণে এবার বন্দরনগরী ছিল আইসিইউতে। আশার কথা হলো- সরকার নগরবাসীকে এই মহাদুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে।

জলাবদ্ধতার কারণে এবার পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জে শতকোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে। বহু হাসপাতাল পানিতে ভাসতে থাকায় বন্ধ রাখতে হয়েছে চিকিৎসাসেবা। অফিস করতে নৌকা কিনতে দেখা গেছে চট্টগ্রাম কর অঞ্চলের কর্মকর্তাদের। কোমরপানিতে ডুবে থাকা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়কেও চলেছে নৌকা। দিনের পর দিন বন্ধ রাখতে হয়েছে নিম্নাঞ্চলের স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা। আবার জলাবদ্ধতার রুদ্ধরূপ থেকে নগরবাসীকে বাঁচাতে প্রকল্প নিয়ে একসঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা গেছে নগরীর তিনটি সেবা সংস্থাকে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়রের ওপর আস্থা না রেখে ২০১৭ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মাধ্যমেই জলাবদ্ধতা নিরসনে পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

জলাবদ্ধতায় ৫০ লাখ নগরবাসীর জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠায় প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকায় পৃথক তিনটি প্রকল্প নিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। চসিক চীনের আর্থিক সহায়তায় জিটুজি পদ্ধতিতে ‘চট্টগ্রাম নগরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি’ নামে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেয়। অন্যদিকে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের কথা বলে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প দেয় সিডিএ। আবার জলাবদ্ধতা নিরসনে ‘চট্টগ্রাম নগরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসন’ শীর্ষক আরেকটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। শেষ পর্যন্ত সিডিএর জমা দেওয়া পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে সরকার। তবে প্রকল্প তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে চসিককে। এটি নিয়ে দুই সংস্থার মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হওয়ায় প্রকল্পটির কারিগরি দিক দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় সেনাবাহিনীকে। নতুন বছরে পুরোদমে চলবে এ প্রকল্পের কার্যক্রম।

জোয়ার-ভাটায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে ২০১৭ সালে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদে সড়কের ওপর নৌকা নামিয়ে যাতায়াত করেছে সাধারণ মানুষ। চট্টগ্রাম কর অঞ্চল-৪ কর্তৃপক্ষ ২৬ হাজার টাকায় একটি নৌকা কিনে আনে। সিজিও বিল্ডিং-১ ও ২-এ থাকা সরকারি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও বানিয়েছে নৌকা। এ দুটি ভবনে ৪০ থেকে ৫০টি সরকারি অফিসের দপ্তর রয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে এ বছর টানা আট মাসেরও বেশি সময় কোমর সমান পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়েছে সিডিএ, হালিশহর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ষোলশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁওসহ নগরীর সব নিম্নাঞ্চলে থাকা বাসিন্দাদের। নদী ও বৃষ্টির পানি একাকার হওয়ায় নগরবাসীকে চলতে হয়েছে জোয়ার-ভাটার হিসাব করে। একই হিসাব মেনে নগরীর নিম্নাঞ্চলে স্কুল-কলেজের ক্লাস হয়েছে। এবার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হওয়ায় ভোগান্তিও ছিল চরমে। আগে নগরীর নির্দিষ্ট কিছু অংশ হাঁটুপানিতে ডুবলেও এবার দীর্ঘসময় দুই-তৃতীয়াংশেই ছিল জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ আলী আশরাফ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও এ বছর যেন আইসিইউতে ছিল এটি। বছরের বেশিরভাগ সময় নিম্নাঞ্চলে ছিল কোমরপানি। নগরীকে পরিকল্পিতভাবে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। জলাবদ্ধতা নিরসনে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে সমন্বিতভাবে। এসব প্রকল্প যদি যে যার মতো করে বাস্তবায়ন করেন, তবে অতীতের মতো এবারও জলে যাবে সব টাকা। আগামী বর্ষায় আবারও হাজির হবে দুর্ভোগ।’ সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি প্রফেসর সিকান্দার খান বলেন, ‘জলাবদ্ধতার কারণে স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ভোগ হয়েছে ২০১৭ সালে। এ জন্য অনেক বদনাম কুড়াতে হয়েছে মেয়রকে। আসলে বাণিজ্যিক রাজধানীর সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে জরুরিভিত্তিতে সমন্বিতভাবেই সমাধান করতে হবে এ সমস্যা। জলাবদ্ধতা নিরসনে যে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সেটির কাজ যাতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় উপযুক্ত মান রেখে সম্পন্ন করা হয়, সে বিষয়ে নজর দিতে হবে নতুন বছরে।’

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: