প্রচ্ছদ / জীবনধারা / বিস্তারিত

জীবনানন্দের রূপমুগ্ধ বাংলাপ্রেমী

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৪:৩৬:১৮

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি জীবনানন্দ দাশের তিরোধানের পর তাঁকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ হতে দীর্ঘ ১৭ বছর লেগে গিয়েছিল। জীবনানন্দ নামে গোপালচন্দ্র রায়ের এই গ্রন্থটি প্রকাশের দীর্ঘ ১৯ বছর পর আমাদের লজ্জায় অধোবদন করে দিয়ে জীবনানন্দের ওপর সম্পূর্ণ গবেষণাধর্মী একটি সাহিত্যিক-জীবনী আ পোয়েট অ্যাপার্ট রচনা করেন মার্কিন গবেষক ও অধ্যাপক ক্লিন্টন বুথ সিলি। সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এ রকম সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থের প্রকাশ আমাদের জন্য কোনোভাবে স্বস্তি ও গৌরবের বিষয় ছিল না, কারণ বাংলার বিরলপ্রজ এই কবির ওপর একখানি প্রতিনিধিত্বশীল ও সুসমন্বিত গ্রন্থের জন্য একজন ভিনদেশি গবেষকের ওপর যেন নির্ভর করে ছিলাম আমরা। উভয় বাংলার কোনো গবেষক কেন জীবনানন্দকে এ রকম মমত্বের সঙ্গে উন্মোচনের তাগিদ অনুভব করেননি, সেটাও এক পরম বিস্ময়। আরও বিস্ময়কর যে ১৯৬০-এর দশকে বরিশালে তাঁর কয়েক বছর অবস্থানকালে যাঁর নামটিও তিনি শোনেননি, সেই জীবনানন্দই ছিল পরবর্তীকালে তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয়।

জীবনানন্দ বিষয়ে আগ্রহ সম্পর্কে ক্লিন্টন ২০০৬ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (শারদীয় কবিসম্মেলন পত্রিকায় প্রকাশিত) বলেন, জ্যোতির্ময় দত্ত (বুদ্ধদেব বসুর জামাতা) ‘আমাকে জীবনানন্দের কবিতার সঙ্গে পরিচিত করিয়েছিলেন। কোন কবিতাটি আমরা প্রথম পড়েছিলাম আমি মনে করতে পারছি না, বোধ হয় “আট বছর আগের একদিন”, যেটিতে ছিল তাড়া করে ফেরা আত্মহত্যা, মানুষের রক্তের ভেতর খেলা করা “বিপন্ন বিস্ময়” এবং লাশকাটা ঘর। সেই শব্দগুচ্ছ, জানালা গলে আসা নিস্তব্ধতার চিত্রকল্প, সেই নিস্তব্ধতা উটের গ্রীবায় পরিণত হয়ে ঘাড় বাঁকা করে মাথা বাড়িয়ে দেয় জানালার ভেতর দিয়ে—কী এক চিত্রকল্প! তবে সেটা ছিল আরম্ভ মাত্র। কে এই লোক, কে লিখেছে কবিতার এই সব পঙ্ক্তি, এঁকেছে এই সব মানসিক চিত্রাবলি? জ্যোতি আমাকে তাঁর সম্পর্কে কিছু কিছু বলেছিলেন, তবে এ-ও বলেছিলেন যে আমার বাংলা পর্বের প্রথম দুই বছর কাটানো শহর বরিশালের এই নির্জনতাকামী, মুখচোরা, লাজুক কবিটি সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায়নি। তখনো মনে হতো এবং এখনো মনে হয়, তাঁকে এবং তাঁর কবিতা সম্পর্কে জানার প্রয়াসমূল্য আছে।’

বস্তুত, সে সময় থেকেই বাংলার এই ‘নির্জনতম’ কবি তাঁকে বিমোহিত করেন। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভটির নাম ছিল ডো ইন হিট: অ্যা ক্রিটিক্যাল বায়োগ্রাফি অব দ্য বেঙ্গলি পোয়েট জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। উল্লেখ্য, ক্লিন্টন জীবনানন্দের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় ব্যবহৃত ‘ঘাইহরিণী’ শব্দটির ইংরেজি করেছিলেন ‘ডো ইন হিট’।

বাংলাপ্রেমী গুটি কয়েক বিদেশির তালিকায় আমরা যদি ক্লিন্টনকে শীর্ষে স্থান না দিই, সেটি হবে আমাদেরই ব্যর্থতা। শুধু স্থান দেওয়া নয়, তাঁকে বাংলাদেশের সাম্মানিক নাগরিকত্বও দেওয়া উচিত। জীবনানন্দের সাহিত্যিক-জীবনী রচনার মধ্যেই তাঁর বাংলাপ্রীতি থেমে থাকেনি। বাংলায় প্রবন্ধ রচনা করেছেন একাধিক, যেমন ‘আট বছর আগের এক বিস্ময়কর মৃত্যু’, ‘অসাধারণ অথচ স্বাভাবিক এক ভাষাশিল্পী’, ‘মাইকেলের হাতে রামাদি চরিত্র’, ‘দুই বাংলা না দুই বাঙালি’ ইত্যাদি। বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন দ্য স্লেইং অব মেঘনাদ শিরোনামে মেঘনাদবধ, লিওনার্ড নাথানের সঙ্গে অনুবাদ করেছেন গ্রেস অ্যান্ড মার্সি ইন হার ওয়াইল্ড হেয়ার নামে রামপ্রসাদের কালীবন্দনা, ইট রেইনড অল নাইট নামে অনুবাদ করেছেন বুদ্ধদেব বসুর রাতভর বৃষ্টি। বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড বইয়ে তিনি লিখেছেন জীবনানন্দ ও মেঘনাদবধ ছাড়াও ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গল, রবীন্দ্রনাথ, মঙ্গলকাব্য, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ রায়, রিজিয়া রহমান প্রসঙ্গে। রমা দত্তের সঙ্গে মিলে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন রবীন্দ্রনাথবিষয়ক বই সেলেব্রেটিং টেগোর: আ কালেকশান অব এসেজ। ক্লিন্টনের অন্যান্য বইয়ের তালিকায় পাওয়া যায় তাঁর বাংলাপ্রীতির পরিচয়, যেমন উওমেন, পলিটিক্স অ্যান্ড লিটারেচার ইন বেঙ্গল, আ বেঙ্গলি প্রোজ রিডার ফর সেকেন্ড ইয়ার স্টুডেন্টস, ইন্টারমিডিয়েট বাংলা, ক্যালকাটা, বাংলাদেশ অ্যান্ড বেঙ্গল স্টাডিজ: নাইন্টিন নাইন্টি বেঙ্গল স্টাডিজ কনফারেন্স প্রসিডিংস, বেঙ্গল স্টাডিজ: আ কালেকশান অব এসেজ।

তাঁর বরিশাল স্মৃতির সবকিছু না হলেও প্রায় সব কথাই তিনি লিখেছেন। তবে এখন সেসব দিনের কথা ভাবতে ভালোই লাগে তাঁর। এক ব্যক্তিগত বার্তায় এই নিবন্ধকারকে তিনি লেখেন, ‘…দেখতে পাই হাসপাতাল রোডে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জমিদারবাড়িতে অবস্থিত ইউসিসে আড্ডা দেওয়ার জন্য বগুড়া রোড ধরে হেঁটে যাচ্ছি আমি। এই আড্ডায় আসতেন বিএম কলেজের অধ্যাপকেরা। এখানে রবীন্দ্রনাথসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতো, কিন্তু সেখানে জীবনানন্দের নাম কখনো উঠেছে কি না বলতে পারি না।’

এখন সাতাত্তর বছর বয়সে এসেও তাঁর লেখালেখি থেমে নেই। অতি সম্প্রতি তিনি লিখেছেন ক্যারোলিন ব্রাউন অনূদিত মোহাম্মদ রফিকের কাব্য সংকলনের ভূমিকা। জানালেন, গায়ত্রী চক

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: