প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / বিস্তারিত

প্লাস্টিক বর্জ্যের পুনরুদ্ধার: “ক্ষতিকর প্লাস্টিক হবে উন্নত জ্বালানি”

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:৩৩:১৭

প্লাস্টিক ব্যবহার না করে আমাদের আধুনিক বিশ্বের একটি দিন কল্পনা করা কঠিন। মানব ইতিহাসে অনান্য আবিষ্কারের মধ্যে প্লাস্টিক অন্যতম এক আবিষ্কার যা মানবজাতির জীবনযাত্রাকে সহজ করে তুলেছে। প্লাস্টিক মূলত এক ধরনের জৈব যৌগের পলিমার যা নমনীয় এবং প্রায় সবধরনের আকৃতি প্রদান করা সম্ভব। কম খরচ, সহজে উৎপাদন যোগ্যতা, বহুমূখীতা, পানির সাথে সংবেদনহীনতা ইত্যাদি কারণে প্লাস্টিক কাগজের ক্লিপ থেকে মহাকাশযানের বিভিন্ন ধরনের বহুমূখী পণ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এক কথায় প্লাস্টিক মানবজাতির জন্য এক আশির্বাদ ।
প্লাস্টিকের বহুবিধ ব্যবহার একে সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীতে বহুল উৎপাদিত ও ব্যবহৃত পদার্থে পরিণত করেছে। প্রতি বছর প্লাস্টিকের বিশ্বব্যাপি উৎপাদন ৪০০ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি। কিন্তু অনান্য মানবসৃষ্ট আবিষ্কারের মতো প্লাস্টিকের কিছু অপরিপূর্ণতা আমাদের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। এবং ক্রমেই এই সংকট বিকট রুপ ধারণ করেছে। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছাড়া এটি অচিরেই পরিণত হবে মানবসৃষ্ট দুর্যোগে।
আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে সভ্যতা যত এগিয়েছে প্লাস্টিকের চাহিদা ততই বেড়েছে। আর আমাদের এই চাহিদা আগামী দিনে পৃথিবীকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। প্লাস্টিক সৃষ্ট সমস্যা হলো প্লাস্টিকের বর্জ্য সমূহ যা প্লাস্টক দূষণ নামে পরিচিত। ১৯৭০ সালে সর্বপ্রথম সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় প্লাস্টিকের উপস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তখন থেকে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে ছোট্ট পাইলট তিমির পেটে প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক দেখে আঁতকে উঠেছে সবাই। সামুদ্রিক ডলফিন পরিবারের সদস্য স্তন্যপায়ী এ প্রাণীর দেহে ৬৪ পাউন্ড পাস্টিক পাওয়া গেছে। তার পেটে মিলেছে প্লাস্টিক ব্যাগ, জাল, দড়ি, পাস্টিকের বস্তা এমনকী প্লাস্টিকের জ্যারিক্যানও। প্লাস্টিক থেকে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সংক্রমণ হয়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে মারা যায় তিমিটি। বর্তমান হারে প্লাস্টিক উৎপাদন চলতে থাকলে ওজনের হিসাবে বিশ্বের জলরাশিতে যে পরিমাণ মাছ আছে ২০৫০ সাল নাগাদ তার চেয়ে বেশি প্লাস্টিক থাকবে। প্লাস্টিক দূষণ পরিবেশের ওপর বিশেষ করে বন্যপ্রাণী, বণ্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং মানবজাতীর ওপর বিরুপ প্রভাব সৃষ্টি করে। নিয়মিত প্লাস্টিক পদার্থের ব্যবহার প্লাস্টিক দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। পলিথিন ব্যাগ, কসমেটিক প্লাস্টিক, গৃহস্থলির প্লাস্টিক এবং বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত বেশিরভাগ প্লাস্টিকের পণ্যের বেশিরভাগই রিসাইকেল বা পুনঃচক্রায়ন হয় না। এগুলো পরিবেশে থেকে বর্জ্যের আকার নিয়ে পরিবেশ দূষণের মাত্রাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্লাস্টিক এমন এক রাসায়নিক পদার্থ যা পরিবেশে পচতে বা কারখানায় পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ করতে প্রচুর সময় লাগে। গ্লোবাল নমেডিক এর তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র আমেরিকাতে প্রতিবছর ৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহৃত হয়। এগুলোর মধ্যে মাত্র ২৪ শতাংশ পুনঃচক্রায়ন করা হয়ে থাকে। এবং ৩.৮ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য আকারে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। অনান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও উল্লেখযোগ্য হারে প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন লক্ষণীয়।
এসব প্লাস্টিক বর্জ্যের বেশিরভাগ অপচনশীল এবং অপ্রক্রিয়া যোগ্য। এসব ক্ষেত্রে ল্যান্ডফিল বা ভূমিভরাট করা হয়ে থাকে এই বর্জ্য দিয়ে, যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। পরিবেশের ক্ষতি আরো দীর্ঘায়িত হ্য় কারণ প্লাস্টিক বর্জ্য শতবছর এমনকি হাজার বছর সময় নেয় পচে মাটির সাথে মিশতে। প্লাস্টিকের ব্যাগের কাঁচামালটি একটি পলিমার যৌগ, যা একটি স্থিতিশীল কাঠামোযুক্ত এবং প্রাকৃতিক মাইক্রোবিয়াল ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সহজে হ্রাস পায় না। অ-নবায়নযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাগটি ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাকৃতিকভাবে পচতে ‍সময় নেয়। যদি বর্জ্য প্লাস্টিকের ব্যাগগুলি পুনর্ব্যবহারযোগ্য না হয় তবে তারা জমিতে মিশ্রিত হবে, যা মাটির সংকোচনের কারণ হবে, ফসলের দ্বারা পুষ্টি এবং পানির শোষণকে প্রভাবিত করবে, ফলস্বরূপ ফলন হ্রাস পাবে। জমি এবং জলে অব্যাহত বর্জ্য প্লাস্টিকের ব্যাগগুলি প্রাণী এবং মাছকে খাদ্য হিসাবে গ্রাস করবে, ফলে মৃত্যু এবং প্রাণী ও মাছের বৃদ্ধি প্রভাবিত হবে কিছু কিছু প্লাস্টিক বিষাক্ত হয় যা ধীরে ধীরে মাটি ভেদ করে ভূগর্ভস্থ পানির সাথে মিশে পানিকে অব্যবহারযোগ্য করে। এই পানি পান এবং ব্যবহার শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। মারাত্মক সব রোগ সৃষ্টি করে এই বিষাক্ত পানি। সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম আজ হুমকির মূখে প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে। প্লাস্টিক বর্জ্য বায়ু পানি মাটি দূষণের মাধ্যমে মানবজাতির স্বাভাবিক জীবনকে ব্যহত করে।
ক্ষতিকর জিনিষ হচ্ছে প্লাস্টিক, বিশেষ করে রিসাইকেল অনুপযোগী প্লাস্টিক। কারণ, এই প্লাস্টিক গলে না, পচে না- থেকে যায় অনন্তকাল পর্যন্ত। তাই বিশ্বের জল ও স্থলের সর্বত্রই মিশে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতি সৃষ্টি করছে। এমনকি মানুষেরও। কারণ, খাদ্য চক্রের প্রক্রিয়ায় এই প্লাস্টিক মিশে যাচ্ছে, যা খেয়ে মানুষ ও প্রাণীকুল নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। প্লাস্টিক ব্যবহার পক্ষান্তরে প্লাস্টিক বর্জ্যের উৎপাদন কোনো ক্রমেই হ্রাস করা সম্ভব হচ্ছে না, এক্ষেত্রে টেকসই সমাধান হতে পারে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটি একই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শক্তির বিকল্প উৎস, এই দুটি সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে ।
যেসব প্লাস্টিক বর্জ্যের পুনঃচক্রায়ন সম্ভব হয়না, সেসব ক্ষেত্রে আমরা ল্যান্ডফিলিং না করে প্লাস্টিক থেকে জালানি তৈরি করতে পারি। এরকম একটি প্রক্রিয়ার নাম হলো পাইরোলাইসিস। এই প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিক বা পলিমার যৌগগুলোকে পাইরোলাইসিস প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেলে সেগুলো না পুড়ে আনবিক বন্ধন শিথিল হয়ে স্রেফ তরলে পরিণত হবে। আর সেই তরল হবে উৎকৃষ্ট জ্বালানী। ব্যাস, সুপারভিলেইন প্লাস্টিক বর্জ্য তখন হয়ে পড়বে সুপারহিরোইন।

পাইরোলাইসিসে প্লাস্টিকগুলোকে অতিউত্তপ্ত করা হয়, কিন্তু তার ধারক বদ্ধ পাত্রে কোন অক্সিজেন থাকে না। অক্সিজেন না থাকার কারণে হাইড্রোকার্বন যৌগ উত্তপ্ত হয় ঠিকই, কিন্তু কোনভাবেই তাতে আগুন লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, যৌগের পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। সুতরাং একটা বিশ্লেষিত তরল পদার্থ মেলে, এবং বলা হচ্ছে, সেটা নাকি আমাদের নিত্য ব্যবহার্য ডিজেলের চেয়ে রীতিমতো উত্তম জ্বালানী। তাহলে প্রতিবছর সারা বিশ্বে যে পরিমাণ প্লাস্টিকের পলিমার যৌগ উৎপন্ন হচ্ছে আর ডাস্টবিনের বোঝা বাড়াচ্ছে, ক্রমে নদী আর মাটিতে ক্ষতিকর গ্যাস মুক্ত করছে, পরিবেশ ধ্বংস করে পৃথিবীকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসের অযোগ্য করে তুলছে, সেই বিশাল পরিমাণটি শাপ না হয়ে, হয়ে উঠবে বর। যে জ্বালানী তেলের দখল নিয়ে এতো আন্তঃদেশীয় যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সে যুদ্ধও রাতারাতি থেমে গিয়ে যুদ্ধবাজ নেতাদের এক হাতে হারিকেন আর হাতে ললিপপ ধরিয়ে দেবে।
প্লাস্টিকের পাইরোলাইসিসের মাধ্যমে পেট্রোলিয়াম উৎপন্ন হয়। ক্যাটালিস্ট এর উপস্থিতিতে উচ্চ তাপমাত্রায় প্লাস্টিকের অণুগুলো ভেঙ্গে যায় যা পরবর্তীতে কনডেনসেশনের ফলে তরল পেট্রোলিয়ামে পরিণত হয়। এই উপায়ে এক কেজি পলিওলেফিন প্লাস্টিক (যেমন, পলিইথিলিন বা পলিপ্রপিলিন) থেকে ৬০০-৭০০ মিলি পেট্রোল অথবা ৮৫০ মিলি ডিজেল পাওয়া সম্ভব। কিংবা ৪৫০-৫০০ মিলি এরোমেটিক যার সাথে বাই প্রোডাক্ট হিসেবে কিছু পরিমাণ এলপি গ্যাস পাওয়া সম্ভব। তবে খরচ কিন্তু খুবই কম। মাত্র ৪০-৫০ টাকা। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তেলের গুণগত মান অনেক বেশি। এসব তেল আমরা গৃহস্থলি এবং বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করতে পারি। SRF এমন আরেকটি প্রক্রিয়া যেখানে প্লাস্টিক ও অনান্য বর্জ্য তাপ উৎপাদন করতে ব্যবহৃত হয়। এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় একে তাপ প্রদান করে অতি উচ্চ গুণগত মান সম্পন্ন গ্যাস, ডিজেল, কেরোসিন, কয়লা এবং একটিভেটেড কার্বন এ পরিণত করা সম্ভব।
এসব প্রক্রিয়া আধুনিক যার ফলে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে গ্যাস, তেল, ভারী জ্বালানী উৎপন্ন হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে, কয়লার থেকে প্রায় দ্বিগুণ তাপ উৎপন্ন করতে সক্ষম এই জ্বালানী। এই প্রক্রিয়া কম ব্যয় সাপেক্ষ এবং গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ খুবই কম। আমাদের শক্তির চাহিদা ‍অনেকাংশে পূরণ করবে প্লাস্টিক বর্জ্য। উন্নত দেশসমূহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যবহার ক্রমেই বেড়ে চলছে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, আমেরিকায় প্রতি বছর যে পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য ল্যান্ডফিলিং হয় তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে প্রায় ১৪ মিলিয়ন বাড়ির শক্তির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

প্লাস্টিক যতই ক্ষতিকর হোক না কেনো বহুবিধ ব্যবহারের কারণে এর ব্যবহার কোনভাবেই হ্রাস করা সম্ভব নয়। মানুষের অভ্যস্ততার কারণে এর ব্যবহার চলতেই থাকবে এবং ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে। সে সাথে ক্ষতিও বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশে প্লাস্টিক এবং পলিথিন নিষিদ্ধকরণের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও টেকসেই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত অন্তরায়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ১১৮ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে চসিক। শুধুমাত্র ঢাকাতেই ১৪ মিলিয়ন পিস পলিথিন ব্যাগ দৈনিক ব্যবহৃত হয়। পুরো বাংলাদেশে এই পরিসংখ্যন আরো ভয়াবহ। এক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে প্লাস্টিক বর্জ্যের পুনরুদ্ধার বা পাইরোলাইসিস প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তেল, গ্যাস। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন সম্পূর্ণই গ্যাস নির্ভর। কিন্তু এই অনবায়নযোগ্য জ্বালানী খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে ঝুকছে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি স্বরুপ। এক্ষেত্রে টেকসই সমাধান হতে পারে প্লাস্টিক বর্জ্য শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করলে। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মক পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বাচাতে পারে, ‍সেই সাথে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক সমাধান হতে পারে।

মো: বদিউজ্জামান লিমন
শিক্ষার্থী ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: