করোনা লাইভ
আজকে আক্রান্ত : ২,৬৯৫ ◈ আজকে মৃত্যু : ৩৭ ◈ মোট সুস্থ্য : ১১,৫৯০
প্রচ্ছদ / সম্পাদকীয় / বিস্তারিত

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের গল্প

৮ এপ্রিল ২০২০, ২:৫১:৩০

ফাহাদ হোসেন হৃদয়ঃ-

স্কুল কলেজের গন্ডি পেরিয়ে সকলেই পা রাখে নতুন এক ঠিকানায়। ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষার্থীরা নতুন ঠিকানার উদ্দেশ্যে এগুতে থাকে। নতুন এই ক্যাম্পাস জীবন কাটানোর স্বপ্ন কারো ইন্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে কারো মেডিক্যাল কলেজ কেউ বা দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের যে কোন একটি। আর এ স্বপ্ন বুনে একই সাথে কলেজ জীবন শেষ করা বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই।

তাই স্বপ্নের ক্যাম্পাসে যেতে রীতিমতো অংশগ্রহণ করতে হয় হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সাথে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষায় ।

শিক্ষার্থী সম পরিমান আসন না থাকায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে গুটিকয়েকজনই বিজয় অর্জন করে ছুঁতে পারে তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। আর এ বিজয়ীরা নতুন ক্যাম্পাস জীবন শুরু করে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে। সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ক্যাম্পাস জীবনের প্রথম দিনের অনুভূতি তুলে ধরেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ ফাহাদ হোসেন হৃদয়।

ভর্তি প্রক্রিয়া শেষে দীর্ঘ বিরতির পর হঠাৎ একদিন নোটিশ এলো ২৯ এপ্রিল, ২০১৯ থেকে ক্লাস শুরু হবে। প্রথম দিন সকাল ৮ টায় ক্লাসে গিয়েই সবচেয়ে মজার যে ঘটনা তা হল সব বেঞ্চে প্রত্যেকের জন্য একটি করে গিফট রাখা। সিনিয়ররা বরন করলো আমাদের এই উপহার দিয়ে। সাথে ছিল শুভেচ্ছা বাণী। ভেতরে চকলেট, আর স্টিকি নোট। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ গনিত শিক্ষক এসেই বোর্ডে। মন খারাপ হয়ে গেল। এরমধ্যে ক্যাল্কুলাসে আমি আগে থেকেই দূর্বল, স্যার শুরুও করল তা দিয়ে। প্রথম ক্লাস হওয়ায় বেশি পড়ান নি। ২য় ক্লাসে স্যার এসে সবার পরিচয় নিল, গল্প করল। এভাবে চারটা ক্লাস শেষ হলো। ইতিমধ্যে আশেপাশে উঁকি দিয়ে কয়েকজনের সাথে পরিচিত হলাম। ভাবলাম ক্লাস শেষ। কিন্তু না প্রথম দিন থেকেই রুটিন অনুযায়ী ল্যাবও হবে।

ক্লাসের আগে নতুন ৩ বন্ধুকে নিয়ে পলাশীর মোড়ে খেতে গেলাম। দ্রুত খাওয়া শেষ করে ক্লাসে ঢুকলাম। ২ঃ৩০ থেকে ল্যাব শুরু। একটু পরেই ম্যাম এসে প্রেজেন্ট ডাকলো। এখনো সবাই আসে নি। পরেরদিন থেকে দেরীতে না আসার জন্য ম্যাম সতর্ক করে দিল। প্রথম দিন হিসেবে ল্যাব করান নি, তবে নিয়মকানুন আর সিলেবাস বুঝিয়ে দিলেন। ল্যাবের জন্য তিন জন করে গ্রুপ করে দিলেন। আমার গ্রুপের অন্য দুই জনের সাথে প্রথম দিনেই অনেক ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। এখন ওরাই আমার ভালো বন্ধু। এভাবেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ক্যাম্পাসে প্রথম দিন কাটে বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগের ২য় বর্ষে শিক্ষার্থী এস.এম শাদমান সাকীবের।

শাহারিয়ার জয় শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। মেডিকেল এ প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি স্বপ্নজয়ের অনুভূতির কথা বলেন। তিনি বলেন, “বহুল প্রতীক্ষার অবসানে, মেডিকেল ক্যাম্পাসে পদার্পন করার সৌভাগ্য হয়েছিল। কত ঝল্পনা কল্পনা শেষে, সেই দিন এসেছিল। কত কথা শুনেছি মেডিকেল নিয়ে, মৃত মানুষের অস্থি দ্বারা অধ্যয়ন থেকে শুরু করে মর্গের লোমহর্ষক গল্প। আকাশসম আশা নিয়ে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ এ কোনো এক সকাল এ চলে আসি। একটু অপ্রস্তুত মনে হচ্ছিল নিজেকে, এত এত মানুষের ভিড়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারব তো?

অতঃপর, আমাদের প্রথম ক্লাস শুরু হয়…।সেদিন আমাদের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস ছিল। তাই খুব সকালেই ক্যাম্পাস চলে আসি। চার দিকে সব অপরিচিত মুখ। কে যে সিনিয়র কে ব্যাচমেট বুঝার সাধ্য কই। আমার ধারণা ছিল, মেডিকেল এর ক্লাস বোধহয় হাসপাতালের ভিতরে হয়। কিন্তু একটা কলেজ প্রাঙ্গন পেয়ে আমার মন আহ্লাদে আটখানা। ওরিয়েন্টেশন শেষে সিনিয়ররা আমাদের সাথে পরিচিত হয়। ক্যাম্পাসে কিভাবে সুষ্ঠুভাবে দিন যাপন করার নির্দেশনা দেন তারা। এরপর সদ্য পরিচিত এক সহপাঠী এর সাথে এতদূর আশার গল্প করি।

ক্যাম্পাস এর বিশাল মাঠ, শহীদ মিনার,পুকুর সবকিছুই ঘুরে দেখলাম। বলা হয়ে থাকে মেডিকেল ক্যাম্পাস তুলনায়,এটা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড়। এত বিশাল ক্যাম্পাস এর অংশ হয়ে আমি গর্বিত। শেষে আমরা অনেকেই দল বেঁধে ক্যাম্পাস ঘুরতে বের হয়েছিলাম। এভাবেই এক দল অচেনা মানুষদের সাথে নিয়ে ডাক্তার হওয়ার যুদ্ধের প্রথম দিনের বর্ণনা দেন শাহরিয়ার জয়।

ফেরদৌস আল হাসান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) আর্কিওলোজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো নবীন ব্যাচ তিনি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের গল্পটা তার কাছে এখনো রঙিন। তিনি বলেন, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া জীবনের সুন্দর স্বপ্নগুলোর একটি। স্কুল কিংবা কলেজের ব্যাক বেঞ্চার থেকে ফাস্ট বেঞ্চার সবার মনে উঁকি দেয় উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বিখ্যাত কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করা মাত্রই শুরু হয় এই স্বপ্নকে ছোঁয়ার প্রকৃত যুদ্ধ, যে যুদ্ধে নিজের ছাঁয়া ও নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে রূপ নেয়। এই যুদ্ধে লক্ষ যোদ্ধার বিপক্ষে যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনতে হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন নামক একটি সোনার হরিণ।

এই যুদ্ধে বিজয়ী আমার মত একজন ক্লান্ত যোদ্ধার কাছে তখন চিন্তার বিষয় কবে শুরু হবে সেই কাঙ্খিত বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। অপেক্ষার প্রহর শেষ করে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। শুরু হল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। প্রথম দিন ক্যাম্পাসে পা রাখতেই অন্যরকম এক আনন্দে মন ভরে যায় এই ভেবে যে, এই ৬৯৭ একরের ক্যাম্পাস এখন থেকে আমারও। আজ আমাদের ওরিয়েন্টেশন। কিছুটা সকালে ক্যাম্পাসে আসলেও ক্লাসে গিয়ে দেখলাম অনেকেই ইতিমধ্যে চলে এসেছে। কিন্তু তারপর পড়লাম একটি নতুন বিড়ম্বনায়। কে সিনিয়র আর কে যে ক্লাসমেট তা বুঝে উঠতে একটু কষ্ট হচ্ছিল।এরপর ক্লাসের মাঝের দিকে একটি বেঞ্চে বসি এবং আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে তুই করে সবার সাথে পরিচয় হই।

হঠাৎ সাদা প্রিন্টের শার্ট পড়া একজন লোক এসে আমাদের নিয়ে গেল ফুল ও বেলুন এর সমন্বয়ে সুসজ্জিত একটি রুমে। যদিও পরে বুঝতে পারলাম ওই লোকটি অন্য কেউ না দেশের অন্যতম সেরা প্রত্নতাত্ত্বিক আমাদের প্রিয় স্বাধীন স্যার। শুরু হলো আমাদের নবীন বরণ অনুষ্ঠান। প্রিয় শিক্ষকদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম জ্ঞানের রাজ্যে। এরপর আমাদের অবাক করে দিয়ে সিনিয়ররা শুরু করলো র্যাগ বিরোধী রাখি বন্ধন উৎসবের। র্যাগের মত একটি জঘন্য সাংস্কৃতির বিপক্ষে সিনিয়র জুনিয়রদের এই সম্মিলিত প্রয়াস নিমিষেই মনটাকে ভরিয়ে তোলে।

পরবর্তীতে চলে বিভাগের এবং সিনিয়রদের পক্ষ থেকে উপহার পাওয়ার পর্ব। এরপর আমরা হারিয়ে যাই সিনিয়রদের সাথে গানের আড্ডায়।এবং শুরু হয় পরিচয় পর্বের। এরমধ্যে যেন একটি রুমে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার মেলবন্ধন ঘটে। ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম শেষ করে আমরা বের হই পুরো ক্যাম্পাস টা ঘুরে দেখার জন্য। এরই মধ্যে চলে আড্ডা, গান এবং নিজের সংস্কৃতিকে অন্যের সাথে বিনিময় করা।এরই মধ্যে দিনের সূর্য অস্তমিত হয় এবং শেষ হয় আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিনটা। এই আনন্দ শঙ্কা কিছু নতুন অভিজ্ঞতা আর এক ঝাঁক বন্ধু ও শিক্ষকদের নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন টা হয়তো স্মৃতির পাতায় লেখা থাকবে আজীবন। এভাবেই নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের রঙিন গল্পটা অকপটে বলে গেলেন ফেরদৌস আল হাসান।

তানবিরুল ইসলাম তানবীর পড়ছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের অনুভূতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ” পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ” যেন সকল শিক্ষার্থীর কাছে স্বপ্নের মতো। আর সেই স্বপ্ন যখন ছোঁয়া যায় তখন মনের মাঝে আনন্দের আর কমতি থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন মানেই স্বপ্ন জয়ের আনন্দ উদাযাপনের দিন।

যাই হক, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন কোন ক্লাস ছিল না। ঐদিন ছিলো আমাদের সেন্ট্রাল ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম। জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের আনন্দ অনুভব হচ্ছিল তখন। সেন্ট্রাল ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামটা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে। বেলা ১০ টায় যখন ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম শুরু হয় তখন মনে হচ্ছিল নতুন এক জ্ঞানের রাজ্য প্রবেশ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দের জ্ঞানগর্ব ও জীবনঘনিষ্ঠ বিভিন্ন দিকনির্দেশনা শুনে নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম শেষে নতুন বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসলাম পুরো ১০১ একরের ক্যাম্পাসে।

নতুন বন্ধুর, নতুন পরিবেশ, নতুন আঙিনা; সবমিলিয়ে দিনটা ছিলো অসাধারণ একটি দিন”।এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনটি স্বপ্নজয়ের আনন্দ উদযাপনের দিন হিসেবে কাটে যায় তানবিরুল ইসলাম তানভীরের।
লেখক
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ ১ ম বর্ষ।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: