করোনা লাইভ
আজকে আক্রান্ত : ১,১০৬ ◈ আজকে মৃত্যু : ৩৬ ◈ মোট সুস্থ্য : ২৬৮,৭৭৭

স্টেশনে ঘুরে বেড়ায়,গাছে গাছে উঠে টিয়া পাখির খোঁজে এভাবেই দিন যায় মিলনের

ভাইয়া আমাদের একটা ঘর করে দেন

১৬ মে ২০২০, ১২:৫৪:০৮

ইকবাল হোসেন জীবন, মিরসরাই প্রতিনিধি::
রেলওয়ের পরিত্যক্ত জীর্ণ শীর্ণ কোয়াটারের কাছে যেতেই মিলনের দেখা। মুখে এক গাল হাসি, বুঝতে বাকি রইলো না সে আমাকে চিনে ফেলেছে। কিছুদিন আগে রেলস্টেশনে দেখা হয়েছিলো মিলনের সাথে। পরনে ছেড়া জামা। মিলনকে সাথে নিয়ে ওদের ঘরে যেতেই দরজায় দেখা মেলে মিলনের মা আলেয়া বেগমের। বয়স ৩৫ বছর। সন্তানকে নিয়ে থাকেন এই কোয়াটারে। স্বামীর ঘরে ঠাই মেলেনি তার।
মীরসরাই উপজেলার খইয়াছড়া ইউনিয়নের বারতাকিয়া রেলস্টেশনের পরিত্যক্ত কোয়াটারে সন্তানকে নিয়ে থাকেন আলেয়া বেগম। এলাকার দেলোয়ার বাবুর্চির সঙ্গে কাজ করতেন বিয়ে বাড়িতে বা কোনো অনুষ্ঠানে। এখন সে কাজ আর করেন না। বর্তমানে সাপ্তাহিক দুইদিন ২০০ টাকা বেতনে ঝাড়– দেয় স্টেশন আর মানুষের বাড়িতে কাজ করেন।

স্টেশনে ঘুরে বেড়ায়,গাছে গাছে উঠে টিয়া পাখির খোঁজে এভাবেই দিন যায় মিলনের। সন্ধ্যা হলেই মা ছেলে স্টেশনে বসে থাকেন। বাতি জ্বালানোর তেল নেই। ঘুমানোর সময় হলেই অল্প সময়ের জন্য বাতি জ্বালিয়ে মা ছেলে খেয়ে ঘুমাতে যান। করোনার প্রসঙ্গ টানতেই বুঝতে পারলাম করোনার ভয়ের চাইতে বড় হলো ক্ষুদার যন্ত্রনা। আলেয়ার বোন রাজিয়া ছাড়া নেই কোনো স্বজন।
আলেয়া বেগমের বাবার বাড়ি রংপুর। আলেয়া বেগম এবং বোন রাজিয়া বেগমের শৈশবে তাদের বাবা বজলুছ ছোবহান স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে জীবিকার উদ্দেশ্য মীরসরাই আসেন। থাকতেন ভাড়া ঘরে। মানুষের জমিতে বর্গা চাষ করতেন।
আলেয়া বেগমের বয়স বাড়তে থাকে। বাবা বিয়ে দেন পাশ্ববর্তী জেলা ফেনীর নুরুল আমিনের কাছে। বিয়ের এক বছর পর তাদের ঘরে জন্ম নেয় মিলন। নুরুল আমিন পেশায় রিক্সাচালক ছিলেন। মিলনের যখন এক বছর তখন তার বাবা আবার বিয়ে করে তাদের রেখে চলে যান। সেই থেকে শুরু হয় আলেয়া বেগমের সংগ্রামী জীবন। আলেয়া বেগমের থাকার কোনো জায়গা নেই। আজ থেকে প্রায় ৮ বছর আগে তখনকার স্টেশন মাস্টার তাদের থাকার জায়গা নাই দেখে রেলস্টেশনের পাশেই পরিত্যক্ত একটি কোয়াটারে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। তবে আজও কোয়াটারে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ।

কৌতুহলবশত আলেয়া বেগমের ঘরে ঢুকতেই দেখা যায় জীর্ণ-শীর্ণ ঘরের মেঝে, জানালা দরজা ভাঙ্গা। নেই খাট, ছেড়া পুরোনো শীতল পাটি মেঝেতে বিছিয়ে ঘুমায় মা ছেলে, মশারি আর কিছু হাড়ি-পাতিল ছাড়া কিছুই নেই ঘরে। নেই গোসলের পানির ব্যবস্থা, স্টেশন পাশে পাহাড়ি ছড়া। ছড়ার পানিতেই গোসল আর খাওয়ার পানি আনা হয় ওখান থেকেই। আলেয়া বেগমের আশেপাশের কিছু মানুষের প্রতি অভিযোগ তাদের ্ওরা ঘৃণা করা। সরকারি ত্রাণ বা কোনো প্রকার সাহায্য পৌছায় না তাদের ঘরে। তবে এলাকার অনেক মানুষ সাহায্য সহযোগিতা করে মাঝে মাঝে এমনটাই জানান।
মিলনকে নিয়ে মায়ের অনেক স্বপ্ন ছেলে পড়ালেখা করবে একদিন মানুষ হবে, চলমান এই অবস্থার পরিবর্তন হবে মিলনের হাত ধরেই। কিন্তু মায়ের দুশ্চিন্তা ছেলের পড়ালেখার খরচ যোগাড় করবে কিভাবে। কে নিবে ছেলের পড়ালেখার দায়িত্ব।
মিলনের সাথে কথা বলতেই মিলন বলে উঠে ভাইয়া আমাদের একটা ঘর করে দেন। আমাদের ঘর ভেঙ্গে ফেলবে। এই কথা শুনেই খটকা লাগে মনে, কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে । মিলনের কাছে জানতে চাইলে মিলন জানায় এলাকার ছেলেরা বলে তাদের ঘর ভেঙ্গে ফেলবে। এইটা নিয়ে মিলনের মায়ের ভীষণ দুশ্চিন্তা। কারণ তাদের নিজেদের ভিটেবাড়ি এবং স্বজন কেউ নেই।

তাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে বারতাকিয়া রেলস্টেশেনের সহকারী স্টেশন মাস্টার গ্রেড-৪ আশরাফ আলী জানায়, এখানে আমি নতুন এসেছি। জানতে পারি অনেক আগে এখানকার স্টেশন মাস্টার তাদের মা ছেলেকে থাকতে দেয় পরিত্যক্ত কোয়াটারে। প্রতি শনিবার ও বৃহস্পতিবার স্টেশন ঝাড়– দেয় মিলনের মা। এছাড়া তিনি আরো বলেন ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলরুট ব্রডগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্রডগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। যার কারণে ভাঙ্গা পড়তে পারে রেলস্টেশন সহ পরিত্যক্ত কোয়াটার।
স্থানীয় তরুণ মেহেরাব অনিক জানায়,আমরা ফ্রেন্ড সার্কেল সহ আমি ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে খোজঁ খবর নিই। বাস্তবতা হচ্ছে ওরা ভিটেমাটিহীন। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে একটি পরিবার বেচে যায়।

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: