করোনা লাইভ
আজকে আক্রান্ত : ২,৬৯৫ ◈ আজকে মৃত্যু : ৩৭ ◈ মোট সুস্থ্য : ১১,৫৯০
প্রচ্ছদ / সারাদেশ / বিস্তারিত

ময়মনসিংহে করোনা তাড়াতে ‘কবুতর চালান’

৮ এপ্রিল ২০২০, ৩:৫৭:০২

ময়মনসিংহ (ত্রিশাল) সংবাদদাতা:
করোনা কোনো সাধারণ রোগ না, এইটা আগেকার দিনের কলেরা, বসন্তের মতোই মহামারী। এইটা একটা দুষ্ট দানব। এইটা এমনিতেই যাবে না। একে তাড়াতে হবে’Ñ এমন কুসংস্কার থেকেই রাতের আঁধারে দেওয়া হলো ‘কইতর চালান’ (মন্ত্র পড়ে কবুতর ছেড়ে দেওয়া হয়)। আর সঙ্গে সঙ্গে ভাঙা টিন, থালা-বাটি, হাঁড়ি-পাতিল ঢোলের মতো পিটিয়ে শব্দ করে এবং আদিম কোনো জাতির ন্যায় একসঙ্গে উচ্চস্বরে আওয়াজ তুলল কয়েক লাখ মানুষ। এমনই এক ঘটনা ঘটেছে গত সোমবার রাতে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলায়। এই অদ্ভুত যজ্ঞে অংশ নেয় ফুলবাড়িয়া উপজেলার ১৩ ইউনিয়ন ও পৌরসভা এবং পার্শ্ববর্তী মুক্তাগাছা, মধুপুর ও ত্রিশাল উপজেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে হঠাৎ করেই হই-হই রব এবং ঢাক-ঢোল পেটানো শুরু হয়। চলছিল দীর্ঘক্ষণ ধরে। পরে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী তিন উপজেলায়ও এই যজ্ঞ চলে। এ সময় মুখে-মুখে প্রচার হচ্ছিলÑ কইতর চালনা দেওয়া হয়েছে। এই কবুতর যাদের বাড়ির চালে বসবে সেখানেই মরণব্যাধী করোনা বাসা বাঁধবে। এমন সংস্কারে বিভিন্ন গ্রামের ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ লাখ লাখ মানুষ ঘর থেকে মুড়ির টিন, ভাঙা টিন, ক্যান্টি, টিন বা কাসার থালা, স্কুলের ঘন্ট, ঢোল, পাতিল, হাড়ি যে যা পারেন নানা কিছু নিয়ে কাটি দিয়ে পিটিয়ে শব্দ করে। মুখে-মুখে ছিলÑ ‘করোনা দূরে যা, করোনা দূরে যা।’

ফুলবাড়িয়ার পীড়গঞ্জ বাজার এলাকার বৃদ্ধ মমতাজ আলী বলেন, আমরা অনেক ছোট থাকতে দেখতাম কলেরা বা বসন্ত মহামারী আকারে দেখা দিলে বৈদ্য, কবিরাজরা রাতে মন্ত্র পড়ে কবুতর উড়িয়ে দিত। একে ‘কবুতর চালান দেওয়া’ বলা হতো। তখন সবাই মিলে নানা কিছু পিটিয়ে শব্দ করে এই কবুতরকে তাড়াত। আর বলতÑ ‘এই কবুতর যত দূরে যাবে, কলেরা বা বসন্তরোগও তত দূরে চলে যাবে। আর যাদের বাড়িতে এই কবুতর বসবে, তাদের বাড়িতেই এই রোগে সবাই উজার হবে। এটা মূলত অন্ধ বিশ্বাস থেকেই করা হতো। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন পর করোনা ভাইরাস তাড়াতে এমন ঘটনার সূত্রপাত হলো। আমি এসব বিশ্বাস করি না। তবে অসহায় অবস্থায় মানুষ নানা কিছুই করে।
কদমতলী গ্রামের আক্কাস আলী বলেন, ‘এত শব্দ শুনে প্রথমে আমি ভয় পেয়ে যাই। পরে আমরাও অনুরূপ শব্দ করেছি।’
কইয়ের চালা গ্রামের ছমিরন বেওয়া বলেন, ‘উলাউঠার মতো করেই মহামারী তাড়াতে সোমবার রাতে এমনটি করা হয়। এইবার যে মহামারী আসছে তা থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ এমনটা করেছে। শব্দ না করলে এই রোগ যাইবো না। শব্দ কইরাই তাড়াইতে অইবো।
বাক্তা ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক মাখন বলেন, রাত ৯টার দিকে হঠাৎ এমন শব্দে থমকে যাই। পরে বুঝতে পারি ঘটনাটা কী। তিনি বলেন, এটা অনেক প্রাচীন একটি কুসংস্কার। এতে করোনা বা কোনো মহামারী তাড়ানো সম্ভব নয়। তবু অলৌকিক বিশ্বাস থেকে মানুষ এমনটি করে থাকে।

এমন অদ্ভুত কর্মে অতিষ্ঠ হয়ে অনেকেই রাতে মসজিদে গিয়ে এসব থামানোর ঘোষণা দিয়ে সচেতনতামূলক কথা বলেন।
মুক্তাগাছার বটতলা গ্রামের প্রবীণ রাজনীতিক এসএম আবু সাঈদ বলেন, শব্দটা ফুলবাড়িয়ার দিক থেকে এসেছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আমাদের এলাকায়ও মানুষ এমন অদ্ভুত কর্মকা- শুরু করলে আমরা বাধ্য হয়ে মসজিদের মাইকে মানুষকে সচেতন হওয়ার ঘোষণা দিতে থাকি। এক পর্যায়ে বিভিন্ন মসজিদে ঘোষণা শুরু হলে এই এলাকাতে ঘটনাটি থেমে যায়।
এ নিয়ে রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শত শত পোস্ট দেখা যায়। সেখানে নানাজন নানা মন্তব্য করেন।
সাইফুল ইসলাম তরফদার নামে স্থানীয় এক সাংবাদিক তার ফেসবুক ওয়ালে পোস্টে লেখেনÑ ‘আগে কলেরা তাড়াত, এবার করোনা ভাইরাস তাড়াতে টিন-থালা পেটাল মানুষ।

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: