প্রচ্ছদ / রাজনীতি / বিস্তারিত

মতামত

যেসব কারণে এরশাদ আমার পছন্দের ছিলো

১৬ জুলাই ২০১৯, ১১:৩৫:০৩

লেখক – আতাউর রহমান কাবুল
সহ সম্পাদক, দৈনিক কালের কন্ঠ

সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আমি একবার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।

সম্ভবত ১৯৮৮ সাল এবং আমি তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। এরশাদ গিয়েছিলেন আমাদের তেঁতুলিয়ার শালবাহানে তেলের খনি উদ্বোধন করতে। মনে পড়ে, ধান ক্ষেতের আইল, মাঠ-ঘাট, জঙ্গল পেরিয়ে বাড়ী থেকে ৪-৫ মাইল দুরের পুরো রাস্তা সেদিন দৌড়ে পৌঁছেছিলাম এরশাদের হেলিকপ্টারের নিকটে। আমার থেকে মাত্র ৩/৪ হাত দুরে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁকে সেদিন এই রাষ্ট্রনায়ককে দেখার সুযোগ হয়েছিলো আমার। শুধু একটা কথা মনে পড়ছে। ছোট হ্যান্ড মাইকে তিনি বলছিলেন, ‘আপনাদের পঞ্চগড়বাসীর ভাগ্য খুলে গেছে!’
যদিও পরবর্তীতে সেই খনির মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো চিরতরে। শুনেছি, ভারতকে সুবিধা দিতেই সে কাজ করা হয়েছিলো! ফ্রান্সের কোম্পানি ফস্টাল সেখান থেকে সব গুটিয়ে চলে এসেছিলো!

ছোটবেলায় এরশাদের ভাষণ আমি মাঝে মাঝে শুনতাম রেডিওতে । মনে পড়ে, ১৯৯০ সালে পদত্যাগের দুই দিন আগে কোন এক সন্ধ্যারাদে রেডিওতে ভাষণে তিনি বলছিলেন, ‘আমার দেহে এক ফোঁটা রক্তবিন্দু থাকতে আমি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবো না…।’ এর দুই/তিনদিনের মাথায় গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ঠিক কি কারনে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন সেটা বোঝার মতো বয়স তখন আমার হয়নি। এরপর ১৯৯১ সালে এরশাদ গ্রেপ্তার হলে তাকে কারাবন্দি করে রাখা হয়।

পতিত স্বৈরশাষক বলুন আর যাই বলুন এই এরশাদ সাহেবকে আমার ভালোই লাগতো। কিন্তু কোনদিন তাঁর দল জাতীয় পার্টি করিনি বা কোনদিন তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাতও হয়নি।

আমরা জানি, ১৯৮৮ সালে সামরিক শাসক এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেছিলেন। তখন এর প্রবল প্রতিবাদ করেছিল আওয়ামীলীগ, বিএনপি এমনকি জামায়াতও। প্রতিবাদে হরতালও করেছিল দলগুলো। খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, ‘এটা ধর্মের নামে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা’। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘সংবিধানের এই সংশোধনী জনগণ মানবে না’। জামায়াত বিবৃতিতে বলেছিল, ‘সরকার তাদের গণবিরোধী কার্যকলাপ ঢাকা দেওয়ার জন্য ইসলামের নাম ব্যবহার করছেন’।

এরশাদই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সব মসজিদ-মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ, পানি বিল মওকুফ করেছিলেন। মন্দিরের বিদ্যৎুবিল মওকুফ, হিন্দু কল্যান ট্রাষ্ট, বৌদ্ধ কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেছিলেন। তিনি যাকাত বোর্ড গঠন, দাখিলকে এসএসসি এবং আলিমকে এইচএসসি সনদের সমমানের মর্যাদা প্রদান করেন। এছাড়াও এবতেদায়ী শিক্ষকদের মাসিক অনুদান প্রদান, এলজিআরডি গঠন, যমুনা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ, ঈমামদের জন্যে ভাতা প্রথা চালু, দুই ঈদে দু’টি বোনাস চালু, রেডিও টিভিতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান প্রচারের ব্যবস্থা, জুম্মার দিন অর্থাৎ শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন ঘোষণা করে তিনি আপামর মুসলিম জনসাধারণকে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছেন।

আমার ধারণা, তিনি এতোটা খারাপ ছিলেন না যতটা তাঁর সম্পর্কে বলা হয়। বরং এদেশের রাজনীতিবিদরাই তাঁকে খারাপ বানিয়ে ঢোল বাজিয়েছে আর আমরাও সেই ঢোলে তাল মিলিয়েছি। অথচ সেই রাজনীতিবিদরাই এরশাদকে নিয়ে কি ফায়দাটাই না লুটলেন! এরশাদকে যখন মামলার পর মামলায় অভিযুক্ত করে খালেদা জিয়া সরকার জেলখানায় ঢোকাল, তখন হয়তো অনেকের ধারণা হয়েছিলো, এরশাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখানেই শেষ! কিন্তু দু’বছর না যেতেই সে ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর দুই নেত্রী হাসিনা এবং খালেদাকে সেই এরশাদের সামনে হাজির হতে হলো। অবশেষে তিনি শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস করলেন। এরশাদের সমর্থন নিয়ে আওয়ামীলীগ তখন ঐক্যমতের সরকার গঠন করলো এবং এরশাদ জেলের বাইরে চলে এলেন। বলা যায়, এই কারাজীবনই তাকে বদলে দিয়েছে। তিনি কারাগারকে মারাত্মক ভয় পেতেন এজন্য যে তার মাথায় ঝুলছিল অনেকগুলো মামলা।

আমার মতে, এরশাদের শাষণের সময়টা ছিলো স্বর্ণযুগ। তাঁর আমলে যে উন্নতি হয়েছে তার তুলনা হয় না। এই যে দেখছি মিরপুর-শ্যাওড়া পাড়া রোড, যাত্রাবাড়ী সায়দাবাদ রোড, ডিএনডি বাঁধ (ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ) এগুলো তারই নেয়া উদ্যোগ। তিনি পথশিশুদের জন্য ফুলকলি ট্রাস্ট করেছেন, ভূমিহীনদের জন্য গুচ্ছগ্রাম করেছেন। তিস্তা ব্যারেজ, ঠাকুরগাও এ টাঙ্গন ব্যারেজ, পাবনা সেচ প্রকল্প, উত্তরবঙ্গে বরেন্দ্র সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প তারই হাতে গড়া। এছাড়াও শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে উপজেলা সৃষ্টি, ঔপনিবেশিক আমলের মহকুমা ব্যবস্থা ভেঙ্গে ১৯ টি মহকুমা থেকে ৬৪টি আধুনিক জেলা পরিষদ গঠন, শত বছরের ত্রুটিযুক্ত ভূমি জরিপের সংস্কার, সিকিমূল্যে সার সরবরাহ এবং ট্রাক্টরসহ সকল কৃষি সরঞ্জামের কর মওকুফ, দেশে ৫টি সার কারখানা প্রতিষ্ঠা (এরপর আর কোনো সার কারখানা স্থাপিত হয়নি) এসবই তাঁর কৃতিত্ব।

আপনারাই বলুন, এরপর কোন সরকার আমাদের জন্য এতো সব উদ্যোগ নিয়েছেন? ক্ষমতা দখল করে অনেকেই সরকারে এসেছেন কিন্তু তাঁর মতো করে জনগণের জন্য এতো ভাবনাটা ভেবেছেন কে? তিনি নতুন সমাজ ব্যবস্থা তথা নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হয়তো বা সুযোগ পেলে সেটা গড়ে দেখাতেন।

একজন সেনানায়ক হয়েও তিনি গ্রামকে ভালোবাসতেন। এরশাদের নেয়া প্রতিটি কর্মসূ্চি থাকতো গ্রামের মানুষ তথা কৃষকের মুখে হাসি ফোঁটানোর জন্য। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক যিনি কৃষকের প্রকৃত ব্যথা বুঝতেন। তাঁর আমলে কৃষকের ধান ক্ষেতে পরে থাকতো না বা গুলি খেয়ে কৃষককে মরতেও হতো না। তাঁর মূলনীতি বা মূল স্লোগান ছিলো ৬৮ হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। এমন একটি সত্য ভবিষ্যতদানী আর কোন রাজনীতিক করে গেছেন আমাদের জন্য?

যদিও আমি তখন খুব ছোট। কিন্তু সেই ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় এই রাষ্টনায়ককে দেখেছি, পানির মধ্যে নেমে ত্রাণ বিতরণ করছেন। ওই সময় দেশের ৯০ ভাগ ভূমি পানির নিচে ডুবে গিয়েছিল। তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে ছুটে গেছেন। সামরিক বাহিনীকে রিলিফের কাজে নিয়োজিত করেছেন। কৃষকদের তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের ভয় নেই, তোমাদের পাশে আমি আছি। তোমাদের চোখের জল মুছে দেবো। তোমাদের বিধ্বস্ত বাড়ীঘর আবার নতুন করে গড়ে তুলবো। তোমাদের পেটে আহার তুলে দেবো, তোমাদের পরনে আমার কাপড় দেবো।’ কৃষকের জন্য এতো দরদ আর কেই বা দেখাতে পেরেছে বলুন?

এরশাদের গড়া জাতীয় পার্টির প্রতি মানুষের প্রবল ভালোবাসা ছিলো এক সময়। কিন্তু অনেকগুলো বিতর্কিত কর্মকান্ডে সেই জাতীয় পার্টি মানুষের কাছে সেই আস্থার জায়গাটা হারালেও এদেশের মানুষের মনে এরশাদের আসন কিন্তু ঠিকই ছিলো। সেই এরশাদ আজ না ফেরার দেশে! ভালোমন্দ মিলিয়েই মানুষ। এরশাদ হয়তো বা ভুলের উর্ধ্বে ছিলেন না। কিন্তু নানামূখী উন্নয়ন কর্মকান্ড আর গ্রামবাংলার মানুষের প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা ছিলো সেজন্য আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করতেই পারি। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদের কবরকে বেহেস্তের বাগানে পরিণত করুন। আমিন।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: