শিরোনাম
     করোনা লাইভ
আজকে আক্রান্ত : ১,২৩০ ◈ আজকে মৃত্যু : ৩৩ ◈ মোট সুস্থ্য : ৭১৫,৩২১

কামরুল হাসান মুরাদ

ঝালকাঠি প্রতিনিধি

রাজাপুরে রমজান উপলক্ষে ব্যস্ত হাতে ভাজা মুড়ি কারিগররা

২৭ মে ২০১৮, ৫:১৫:১৫

কামরুল হাসান মুরাদ:: রমজান উপলক্ষে ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার হাতে মুড়ি ভাজা কারিগররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। রমজানের চাহিদা মেটাতে নারীদের সাথে পুরুষরাও সমানতালে মুড়ি প্রস্তুত কাজ করতেছে। নারী-পুরুষের পাশাপাশি বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরাও মুড়ি ভাজার কাজে তাদের মা-বোন, ঠাকুরমাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে।মচমচে ভাজা মুড়ি সবার কাছেই প্রিয়। বছরের প্রতিটি মাসেই মুড়ি তৈরির কাজ করেন কারিগররা।

রমজানে ইফতারিতে মুড়ি যেন অপরিহার্য,মুড়ির বিকল্প নেই। তাই পুরো রমজান মাসেই মুড়ির চাহিদা অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় কারিগররা ব্যস্ত সময় পার করছেন।কোন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই হাতে ভাজা উৎপাদিত মুড়ি স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু হওয়ায় দেশ জুড়ে এর চাহিদা রয়েছে। রাজাপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেডিকেল মোড় এলাকার দাস বাড়ি ও সাতুরিয়া ইউনিয়নের দক্ষিন তারাবুনিয়া গ্রামের দাস বাড়িতে সারা বছর ধরেই চলে মুড়ি ভাজার কাজ হয়। তবে রমজান উপলক্ষে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুন। তাই এসব বাড়ি এখন দিন-রাত মোটা চালের মোটা মুড়ি ভাজার কাজ চলছে। হাতে মুড়ি ভাজা বাড়ির শতাধিক পরিবার যুগ যুগ ধরে মুড়ি ভেজে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। প্রতিটি পরিবারে একজন নারী হাতে মুড়ি ভাজার মূল ভূমিকায় রয়েছেন। তাকে পরিবারের অন্য সদস্যরা সহায়তা করে থাকেন। রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার ছাড়া এসব স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদ মুড়ি এখন ঝালকাঠি,পিরোজপুর,বরিশাল,ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হয়। উৎপাদনের ব্যাপকতার কারনে হাতে মুড়ি ভাজা বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

রাজাপুর উপজেলার হাতে মুড়ি ভাজার বাড়ি গুলোর প্রায় সবারই প্রধান পেশা মুড়ি ভাজা।রমজান উপলক্ষে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদাকে ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাতে মুড়ি ভাজার বাড়ির নারী-পুরুষ এমনকি শিশুরাও। এখানকার মুড়ি স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু হওয়ায় সারা দেশেই এর সমাদর রয়েছে।ঝালকাঠি,বরিশাল,ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা এখান থেকে মুড়ি নেয়।

হাতে মুড়ি ভাজার কৌশলের বিষয়ে হাতে মুড়ি ভাজা কারিগর মালতি বালাদার জানান, হাতে মুড়ি ভাজতে হলে হাতের টেকনিক জানাটা অনেক দরকার। পাশাপাশি মুড়ি ভাজার উপযোগী মাটির চুলা ও সরজ্ঞামের গুরুত্বও অনেক। প্রথমে মোটা ধান সেদ্ধো করে পানিতে বিজিয়ে রাখা হয় তিন দিন এর পর আবার সেদ্ধো করে রোদে শুকানো হয়,এর পর শুকনো মোটা ধান কলে নিয়ে চাল করা হয়। মোটা চাল লবন পানির সঙ্গে মিশিয়ে মাটির পাত্রে হালকা ভাজেন। চাল ভাজার পাশাপাশি অন্য মাটির পাত্রে বালির মিশ্রন গরম করতে হয়। এর পর মাটির অন্য পাতিলের মধ্যে গরম বালি ঢেলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ভাজা চাল ঢেলে দেওয়া হয়।১৫-২০ সেকেন্ডের নারাচাড়ায় তৈরি হয়ে যায় ভালো মানের সুস্বাদু মুড়ি। এক দিনে কেউ কেউ ৫০ কেজি বা অনেকে আবার ১শত কেজি হাতে চালের মুড়ি ভাজেন।

হাতে মুড়ি ভাজা কারিগর সপন দাস বলেন, যুগের পর যুগ ধরে বাপ-দাদার পেশা স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু হাতে মুড়ি ভাজার কাজ করতেছি, কিন্তু হাতে মুড়ি ভেজেও শুধুমাত্র পুঁজির অভাবে ভাগ্য ফেরাতে পারেনি।

হাতে মুড়ি ভাজা কারিগর বাসন্তি রানী দাস বলেন, বার মাস মুড়ি ভেজে থাকি।দিনমজুর হিসাবে ভোর রাত৪টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাজ করে থাকি, প্রতি দিন প্রায় এক শত কেজি মুড়ি ভেজে থাকি।হারভাঙ্গা পরিশ্রম করে প্রতি দিন মাত্র ২৫০টাকা পেয়ে থাকি। এই অর্থ দিয়ে পরিবারের সবার জীবন-জীবিকা ও ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়াসহ সকল যাবতীয় খরচ করতে হয়।

হাতে মুড়ি ভাজা কারিগর বৃদ্ধ কিরন বালা(৮৫) বলেন, কোন সন্তান না থাকার কারনে জীবন-জীবিকার জন্য দিন মজুর হিসাবে মুড়ি ভাজার কাজ করেতেছি।প্রতিদিন ভোর রাত ৪টা থেকে বিকাল ৪টা পযন্ত কাজ করে প্রতিদিন থাকা-খাওয়া সহ নিয়ে প্রতিদিন ৬০টাকা পায় বেচে থাকার জন্য।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এ অ ল থেকে এখন প্রতিদিন দেড় থেকে তিনশ মন মুড়ি দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। যা প্রতি কেজি ৯০-১০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন আড়তদাররা।
মুড়ি ভাজায় জ্বালানী কাঠ ও আনুষঙ্গিক খরচ নিয়ে মন প্রতি চালের মুড়ি তৈরি করে মজুরি পায় মাত্র তিন থেকে চারশত টাকা। এই অর্থেই চলে তাদের জীবন-জীবিকা ছেলে মেয়েদের লেখাপড়াসহ যাবতীয় খরচ।

বছরের পর বছর মুড়ি ভেজেও শুধুমাত্র পুঁজির অভাবে ভাগ্য ফেরাতে পারেনি এই পরিবার গুলো। মুড়ি ভাজাকে কুটির শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে বিশেষ ঋনের ব্যবস্থা করা হবে, এমনটাই এ শিল্পে জড়িতদের প্রত্যাশা।

সাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান বলেন, হাতে মুড়ি ভাজা কারিগরদের উন্নয়নের সব রকমের সহযোগিতা করা হচ্ছে। এদের উন্নয়নের জন্য রাষ্টা ঘাট মেরামত করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: