fbpx
প্রচ্ছদ / সম্পদকীয় / বিস্তারিত

মোজাম্মেল হক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,প্রতিনিধি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ব্যর্থতা : সমাধানে যা করা যেতে পারে।

৩১ আগস্ট ২০১৯, ৯:২৩:১৩

রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশাল এ জনসংখ্যাকে দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ানো আমাদের মতো দেশের জন্য কখনো সুখকর নয়। পর পর দুবার প্রত্যাবাসন চেষ্টাতে ব্যর্থ বাংলাদেশ। কোথাও গিয়ে বাংলাদেশ কূটনৈতিক জালে ফেঁসে যাচ্ছেনা তো? নাকি নিজেদের কূটনৈতিক পরিকল্পনাতেই গলদ রয়েছে?

গত ২০১৭ সালের আগষ্ট মাসে মিয়ানমারে সংঘটিত সামরিক বাহিনীর হাতে জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। যাকে ২০১৭ সালে জাতিসংঘ গণহত্যা বলে বিবৃতি দিয়েছিল।নির্যাতনে পালিয়ে আসা এ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর প্রশংসা অর্জন করে।

বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও গত দুবছরে তাদের একজনকেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আনতে না পেরে এক বিশাল সমস্যার মধ্যে রয়েছে। রোহিঙ্গাদের খুশি মনে ঠাঁই দেওয়া এলাকাবাসী ও এক বিপর্যস্ত অবস্থায় বাস করছে। এমনকি রোহিঙ্গাদের দ্বারা তারা আক্রমণের শিকার পর্যন্ত হচ্ছে। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর ঢলে পরিবেশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ইউএনডিপি এর ইন্টার সেক্টর কোঅরডিনেশন গ্রুপ ( আইএসসিজি) সিচুয়েশন রিপোর্ট অনুযায়ী গত ৩১ শে জুলাই পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের কারণে ৮০০০ একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে । বনভূমি থেকে ৬৮০০ টন জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করেছে। ঐ এলাকার পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। তাছাড়া ও রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমুলক কর্মকাণ্ডের সাথে। ইউএনডিপি এর ঐ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে ৩১ শে জুলাই পর্যন্ত ৪৭১ টি মামলায় ১০৮৮ জন অভিযুক্ত হয়েছে, এর মধ্যে ৩৬৮টি মামলা মাদকদ্রব্য সম্পর্কিত। রোহিঙ্গাদের জঙ্গি ও উগ্রপন্থিদের সাথে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ও করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

২০১৭ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারের সাথে প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে। এর প্রেক্ষিতে গত বছরের নভেম্বর ও সর্বশেষ গত ২২ আগষ্ট ও প্রত্যাবাসনের সবরকম প্রস্তুতি নিয়ে রোহিঙ্গাদের অনিচ্ছার কারণে ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গারা অতীত অভিজ্ঞতার কারণে মিয়ানমারের ওপর আস্থা রাখতে পারছেনা। তারা তাদের প্রত্যাবাসনের শর্ত হিসেবে তাদেরকে নাগরিকত্ব প্রদানসহ ৫ টি দাবি জুড়ে দেয়।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে – জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক জোট পাশে রয়েছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাথে দ্বীপক্ষীয় চুক্তিতে না গিয়ে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যদি সরাসরি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে যেতে পারতো, তাহলে মিয়ানমারের ওপর চাপ বেশি পড়তো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রতি চীন সফর আশা যুগিয়েছিল যে চীন প্রকাশ্যে প্রত্যাবাসনে প্রক্রিয়ায় তৎপর হবে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে চীনের প্রতি বাংলাদেশ যতটা প্রত্যাশা করেছিল চীনকে কূটনৈতিকভাবে অতটা তৎপর মনে হচ্ছেনা, কেননা চীন মৌখিক আশ্বাসের সীমা অতিক্রম করেনি। এমতাবস্থায় চীনকে আরো কার্যকরী তৎপর করার জন্য কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে আরো জোড়ালো ভাবে কাজ করতে হবে।

নিরাপত্তা পরিষদে চীন ছাড়াও মিয়ানমার রাশিয়াকে পাশে পাচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে রাশিয়া মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান করছে। বাংলাদেশের উচিত হবে রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিকভাবে এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা এবং সমস্যা সমাধানে তাদের সাহায্য চাওয়া। তাছাড়াও আশিয়ানকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন, এতে করে আঞ্চলিকভাবে একটি বাড়তি চাপ প্রয়োগ করা যাবে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নীরব ভূমিকা পালন করছে, বন্ধুরাষ্ট্র ভারতকেও কার্যকরভাবে পাশে পাচ্ছেনা বাংলাদেশ। মানবিক আশ্রয়দানের জন্য বিশ্ববাসীর প্রসংশা কুড়ালেও, সমস্যা সমাধানে অঙ্গীকার আদায়ের কূটনীতিতে আশানুরূপ সফলতা পায়নি বাংলাদেশ।

তাছাড়াও বাংলাদেশের উচিত হবে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানে বাধ্য করা এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতাদের ঐ অঞ্চল ঘুরিয়ে আনলে তাদের মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হবে। যা তাদেরকে প্রত্যাবাসনে আগ্রহী করে তুলবে। বিভিন্ন এনজিও সংগঠন নিজেদের স্বার্থের জন্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে নিরুৎসাহিত করছে, এ ব্যাপারে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

মিয়ানমার শুধুমাত্র চুক্তি করেই বিশ্ববাসীকে দেখানোর চেষ্টা করছে যে তারা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আন্তরিক, কিন্তু আদৌ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করানোর জন্য যেরকম নিরাপদ পরিবেশ বা প্রস্তুতির দরকার তার কোনোটিই করছেনা। শুধুমাত্র বিশ্ববাসীর নজর এড়ানোর জন্য, প্রত্যাবাসন নামক একটি কূটনৈতিক নাটক খেলছে।দিন দিন সমস্যা সমাধানের স্থলে আরো জটিল করে তুলছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে তা শুধু বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের জন্য নয়, এ অঞ্চলের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমে ফিরে যাওয়ার নিরাপদ জায়গা তৈরি করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এবং গত দুই প্রত্যাবাসন চেষ্টার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে কাজ করা উচিত, যাতে করে আমরা মিয়ানমারের কূটনৈতিক ফাঁদে আর আটকে না যাই।

লেখক: মোজাম্মেল হক
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
মেইল – mozammeldu93@gmail.com

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: