করোনা লাইভ
আজকে আক্রান্ত : ০ ◈ আজকে মৃত্যু : ০ ◈ মোট সুস্থ্য : ৬৯৮,৪৬৫

১৭ বছরে সুন্দরবনে ২৫ বার অগ্নিকান্ড

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:১৬:৩২

সুন্দরবন থেকে ফিরে মাসুম বিল্লাহঃ
বারবার অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সোন্দর্য হারাচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবন। বিভিন্ন কারনে সংঘঠিত অগ্নিকান্ড ও নাশকতার আগুনে বনের গাছ পালা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় অনেকটা ফাঁকা অনুভব হচ্ছে সুন্দরবন। প্রাকৃতিক এ বনকে চিরচেনা রুপে ফিরতে কিংবা প্রায় ২৫ বারের মত অগ্নিকান্ডের ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। প্রানী ও মৎস্য এবং মধু সহ বনের সম্পদ লুটতে একাধিক চক্র সক্রিয় হওয়ার কারনে বার বার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে সুন্দরবনে। অপরদিকে, বন সংশ্লিষ্ট এলাকার টহল ফাঁড়িগুলোতে পাহারার কাজে ২/৪ জন বনকর্মী থাকলেও বনজ সম্পদ পাচারকারী চক্রের কাছে তারা।
বনবিভাগের দাবী সুন্দরবন লাগোয়া ঘনবসতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য এখন হুমকি। সুন্দরবনকে যে সকল অপরাধ সংঘঠিত হচ্ছে তার অধিকাংশ ঘটনার সাথে ওই জনবসতিদের কারো না কারো সম্পৃক্ততা থাকে। জনবল সংকটের কারনে নিরন্তন চেষ্টা করেও অপরাধী চক্রের লাগাম টানতে পারছেনা বনবিভাগ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনের নানা সম্পদ লুটতে প্রভাবশালী চক্র বনসংলগ্ন এলাকার জনবসতিদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তিকে প্রলোভন দেখিয়ে বনের অভ্যন্তরে পাঠিয়ে অপরাধমুলক কর্মকান্ড করতে একপ্রকার বাধ্য করে।
গত ১৭ বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় ২৫ বারের মত অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলেও অপরাধী চিহ্নিত কিংবা আইনের আওতায় আসেনি প্রভাবশালী চক্র। সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর এলাকাকে ইতিমধ্যে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষন করা হয়েছে। কিন্তু ওই সকল জলাশয়ের মাছ, বনের মধু সহ বনজ ও প্রানী সম্পদ লুটের উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী চক্র কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা কর্মচারীদের ম্যানেজ করে থাকেন। ২০০৪ সাল থেকে গত ১৭ বছরে সুন্দরবনের যে সব এলাকা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই সব এলাকাগুলো আজও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি, নেই বন্যপ্রানীর বিচরণ। বিশেষঞ্জদের মতে, দফায় দফায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সুন্দরবনের ওই সকল স্থানের জীবজন্তু, পশু-পাখি অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। তাছাড়া এভাবে বারবার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলে সুন্দরবন সুরক্ষা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াবে।

নাম গোপন রাখার শর্তে বনসংলগ্ন এলাকার দুই সমাজ সেবক বলেন, সুন্দরবনের পার্শ্বে বসবাসরত বাসিন্দাদের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় সুন্দরবনের ছোট খালে ঢুকে বিষ দিয়ে মাছ ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ও টোপ দিয়ে হরিন শিকারের পাশাপাশি বাঘ হত্যায়ও জড়িয়ে পড়েন। শুষ্কমৌসুম আসলেই অবৈধভাবে বিভিন্ন জলাশয়ের মাছ এবং আগুনের কুন্ডলী সাজিয়ে মধু সংগ্রহ করে থাকে। তাছাড়া বনরক্ষীদের তেমন কোন টহল ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটক সহ সাধারন মানুষের বনের অভ্যন্তরে অবাধ যাতায়াত থাকায় বন্ধ করা যাচ্ছে না সুন্দরবনের নাশকতার আগুন। এমনকি রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা অনেক সময় বনরক্ষীদের উপর প্রভাব খাটিয়ে বনের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের ধান্ধায় তৎপর হয়ে ওঠে। প্রভাবশালীদের কথা অনুযায়ী কাজ না করলে সুন্দরবনে পেশাজীবির কাজ করতে পারেন না বনসংলগ্ন এলাকার অনেক পরিবার। পেশাগত কাজে বনে প্রবেশ করে অনেক অসাধু লোক বন ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেন। তাই এসকল অসাধু পেশাজীবি সহ প্রভাবশালী চক্রের লাগাম টানতে না পারলে সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়বে।

তারা আরো জানান, এপর্যন্ত সুন্দরবনে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলেও বনবিভাগ শুধুমাত্র তদন্ত কমিটি করেই কোনমতে দায় সেরেছেন সুনিদৃষ্টভাবে কোন চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারেননি তারা। একল কাজে প্রভাবশালী চক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তারা ধরাছোয়ার বাইরে। অথচ সুন্দরবনে কোন ঘটনা ঘটলেই প্রভাবশালীদের বাঁচাতে হয়রানির শিকার হন এলাকার সাধারন মানুষ।
বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা প্রভাষক মো. কামাল হোসেন তালুকদার বলেন, পুর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর, কলমতেজী ও নাংলী এলাকায় প্রবেশ করলে বনের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে তেমন কোন গাছপালা দেখা যায় না। চোখে পড়ে শুধু ঘাস আর লতাপাতা। সংশ্লিষ্ট এলাকার বনরক্ষীদের ম্যানেজ করে স্থানীয় কিছু লোক বছর জুড়ে তাদের পালিত মহিষ জঙ্গলে ছেড়ে ঘাস খাওয়ান। অনেকসময় মহিষগুলো দেখাশুনার কাজে নিয়োজিত রাখালদের বিড়ি-সিগারেটের ফেলে দেওয়া ফিল্টারের মাধ্যমেও সুন্দরবনে আগুনের ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি বনে অবৈধ যাতায়াত বন্ধে বনরক্ষীদের কঠোর নজরদারী থাকা উচিত। এছাড়া কোন অসাধু মহল সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে আগুন নিয়ে নাশকতা করতে পারে।

সুন্দরবন সুরক্ষায় নিয়োজিত সুন্দরবন সহ ব্যবস্থাপনা সংগঠন (সিএমসির) শরনখোলা রেঞ্জের সহ-সভাপতি ও শরনখোলা উপজেলা কৃষকলীগের সভাপতি মো. আব্দুল ওয়াদুদ আকন বলেন, বনে আগুন দেয়া একটি বড় ধরনের নাশকতা। তাই দুর্বৃত্তায়নের হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে বনবিভাগের জনবল বৃদ্ধি সহ বনরক্ষীদের আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ২৪ ঘন্টা কঠোর নজরদারী সহ প্রভাবশালী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো. এনামুল হক বলেন, এবারের অগ্নিকান্ডে সুন্দবনের তেমন ক্ষতি হয়নি। বনের কিছু অংশের লতা-পাতা পুড়ে গেছে। খরব পেয়ে তাৎক্ষনিক বনবিভাগ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথ চেষ্টা চালিয়ে আগুন বিনাশ করেছেন। পাশাপাশি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ইতোমধ্যে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে এবং বনের ওই এলাকায় নজরদারী বৃদ্ধি করা হয়েেেছ। অগ্নিকান্ডের কারন অনুসন্ধান করে আগামী সাত কর্ম দিবসের মধ্যে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে এবং বন সংলগ্ন জনবসতি এখন সুন্দরবনের জন্য অনেকটা হুমকি কারন হয়ে দাড়িয়েছে।

এ ব্যাপারে সুন্দরবন পুর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্তকর্তা (ডিএফও) মুহম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, শীঘ্রই সুন্দবনের জনবল সংকট দুর করে বনরক্ষীদের আরো দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য তাদেও উন্নত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হবে। মরে যাওয়া ভোলা নদী খনন সহ সীমানায় কাঁটা তারের বেড়া দেওয়ার জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি আগুন সহ চোরা কারবারীদের গতি বিধির উপর নজর রাখতে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে ওয়াচ টাওয়ার নির্মান করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বিগত দিনের অগ্নিকান্ডের সকল ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: