চালের দামে নিশ্ব হলো আরও ৫ লাখ মানুষ

২৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১:২১:৪০

শুধু চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই গত কয়েক মাসে ৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ গরিব হয়ে গেছে। আগে তাঁরা দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিল, এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। বন্যার পাশাপাশি সময়মতো আমদানি না হওয়ার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে গত কয়েক মাসে হঠাৎ করে চালের দাম গড়ে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এর ফলে দশমিক ৩২ শতাংশ দারিদ্র্য বেড়েছে।

গতকাল শনিবার বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং বা সানেমের বাংলাদেশের অর্থনীতির ত্রৈমাসিক পর্যালোচনায় এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ।
প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সানেম। এতে বক্তব্য দেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। এ সময় সানেমের অন্য গবেষকেরা উপস্থিত ছিলেন। সানেম বলছে, ২১ ডিসেম্বরের হিসাবে চিকন চালের দাম ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা, মাঝারি মানের চাল ৪৮ থেকে ৫৬ টাকা ও মোটা চালের দাম ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এটা সত্যি, চালের দাম বাড়লে গরিব মানুষের কষ্ট বাড়ে, অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। কেননা দারিদ্র্যসীমার একটু ওপরে থাকা মানুষ খাবার কিনতে যত টাকা খরচ করেন, এর ৮০ শতাংশই চাল কেনায় খরচ করতে হয়। তাত্ত্বিক দিক থেকে সানেমের প্রতিবেদন হয়তো ঠিকই আছে। দেখতে হবে, ৩ কোটি ৮০ লাখ গরিব লোকের মধ্যে সোয়া ৫ লাখ তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। চালের দাম কমে গেলে তারা আবার দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে যাবে। এটা তেমন উদ্বেগজনক নয়। তিনি বলেন, সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়েছে। ১০ টাকায় ১ কেজি চাল কেনার সুযোগ, কম মূল্যে খোলাবাজারে চাল বিক্রিসহ নানা উদ্যোগ আছে।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম রায়হান বলেন, আমদানি করার পরও চালের দাম বেড়েছে। এটা বেশ উদ্বেগজনক। বন্যার কারণে চালের উৎপাদন কম হয়। তাই চালের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গরিব মানুষ আয় বাড়িয়ে তা সমন্বয় করার সময় পায়নি। এতে তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। চালের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে তিনি আরও বলেন, সময়মতো চাল আমদানি করা যায়নি। চট্টগ্রাম বন্দরে চাল আসার পর খালাস করে বাজার পর্যন্ত যেতে অনেক সময় লেগেছে। পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা ছিল। এতে চালের দাম আরও বেড়েছে।
সানেম আশঙ্কা করে বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বাড়ছে। এতে সামনের দিনগুলোতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর-এই তিন মাসে ২ হাজার ৯১২ কোটি টাকার চাল আমদানি করা হয়েছে। গতবার একই সময়ে মাত্র ৩৫ কোটি টাকার চাল আমদানি করা হয়েছিল। এই অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যত টাকার চাল আমদানি করা হয়েছে, তা গত পুরো অর্থবছরের চালের আমদানি ব্যয়ের প্রায় ৫ গুণ।
এদিকে গতকাল বিকেলে কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, নাজিরশাইল চাল কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৬৩ থেকে ৬৮ টাকা। আর মিনিকেটের দাম ৫২ থেকে ৫৮ টাকা। ৪৪ টাকার কমে মোটা চাল পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালে কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা বেড়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক খাত নিয়ে সানেম বলছে, ব্যাংক খাতের কেলেঙ্কারি ও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া বেশ উদ্বেগজনক। মূলত দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে এটা হয়েছে। সানেম মনে করে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের চারজন সদস্যকে টানা ৯ বছর ধরে সদস্য থাকার নীতি অনুমোদন দেওয়ায় তা ব্যাংকিং খাতকে আরও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে। বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতায়ন এবং আর্থিক খাতের অপরাধের দ্রুত বিচার করা প্রয়োজন।
২০১৮ সালে অর্থনীতির জন্য পাঁচটি চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করে সানেম। এগুলো হলো, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় বেসরকারি বিনিয়োগে আরও শ্লথগতি; ক্রমবর্ধমান খাদ্য মূল্যস্ফীতি; টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে এগিয়ে যাওয়া, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ এবং ব্যাংক খাত পরিচালনায় অনিয়মের প্রতিকার।

দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।