রাঙ্গাবালীর মাদ্রাসায় শিক্ষক-কর্মচারীর উপস্থিতি ও বেতন নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের দাবি
মোঃ সুজন খান
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়া নেছারিয়া ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় এক শিক্ষিকা ও চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারীর কর্মস্থলে উপস্থিতি ও বেতন উত্তোলন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে ওই শিক্ষিকার বেতনের অর্থ দিয়ে নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে মাদ্রাসায় গিয়ে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষিকা সুমাইয়া খানম (বাংলা সহকারী শিক্ষিকা) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাদ্রাসায় যোগ দেন। অধ্যক্ষ অলিউল্লাহ খানের ভাষ্য অনুযায়ী, যোগদানের পর তিনি প্রায় চার মাস ক্লাস করেন। এরপর ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান। পরে কাজে যোগ দিলেও অসুস্থতার কারণে বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন বলে জানান অধ্যক্ষ।
তবে তার ছুটির আবেদন দেখতে চাইলে অধ্যক্ষ প্রথমে আবেদনটি মাদ্রাসায় থাকার কথা জানান। পরে তা দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে তিনি আবেদনটি কোথায় রাখা হয়েছে, তা জানেন না বলে জানান।
অধ্যক্ষ অলিউল্লাহ খান আরও জানান, সুমাইয়া খানমের বেতনের অর্থ দিয়ে একটি নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনা করা হয়। বিষয়টি মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে একজন শিক্ষিকার বেতনের অর্থ দিয়ে নূরানী মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন দেওয়া সমীচীন হয়নি বলেও মন্তব্য করেন অধ্যক্ষ।
তবে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বক্তব্যে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাদের দাবি, যোগদানের পর সুমাইয়া খানম মাত্র দুই-তিন দিন মাদ্রাসায় এসেছিলেন। এরপর তাকে নিয়মিত দেখা যায়নি এবং তিনি তাদের কোনো ক্লাসও নেননি বলে জানায় তারা।
অন্যদিকে, মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক সুমাইয়া খানমের বেতনের অর্থ দিয়ে নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনার বিষয়ে অবগত নন বলে জানান।
এ বিষয়ে সুমাইয়া খানম বলেন, অসুস্থ হয়ে তিনি মাদ্রাসা থেকে চলে এসেছেন এবং এ বিষয়ে মেডিকেল রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। ছুটি নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি ছুটি নিয়ে আসিনি।” তার বক্তব্যের সঙ্গে অধ্যক্ষের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
এদিকে, মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. মোস্তফার কর্মস্থলে অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মোস্তফার ভাষ্য, তিনি ছয় থেকে সাত মাস ছুটিতে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে বাহাদ্দিন সরদার নামের একজনকে দিয়ে কাজ করানো হয়েছে এবং তাকে মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিভাবক মো. বাচ্চু গাজী, আতিক গাজী ও আলাউদ্দিন গাজী জানান, তারা সুমাইয়া খানমকে মাদ্রাসায় নিয়মিত দেখেননি। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে ভালোভাবে চেনেনও না বলে দাবি করেন তারা। তার বেতনের অর্থ দিয়ে নূরানী মাদ্রাসা পরিচালনার বিষয়টিও তারা শুনেছেন বলে জানান।
অভিভাবকদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও শিক্ষার্থীদের পাঠদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তারা এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
রাঙ্গাবালী উপজেলা শিক্ষা একাডেমিক সুপারভাইজার অনাদী কুমার বাহাদুর বলেন, “বিষয়টি আপনার কাছ থেকে জানলাম। মাদ্রাসার প্রধানের সঙ্গে কথা বলব। স্থানীয়দের কাছ থেকেও তথ্য নিয়ে সত্যতা যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুল হাসান বলেন, “বিষয়টি আপনার কাছ থেকে অবহিত হলাম। প্রিন্সিপালের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষক-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি, বেতন উত্তোলন, হাজিরা সংরক্ষণ এবং বেতনের অর্থ অন্য প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দৈনিক আলোর প্রতিদিন এর প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না
